- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির সংগ্রামের ফল। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের কারণসমূহ:
১। ভাষাগত বৈষম্য: বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিলে পূর্ব বাংলার মানুষ এর তীব্র প্রতিবাদ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবোধকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতার চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২। রাজনৈতিক বৈষম্য: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। জনসংখ্যার দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ প্রতিনিধিত্ব পায়নি। এই রাজনৈতিক বৈষম্য বাঙালিদের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো করে তোলে।
৩। অর্থনৈতিক শোষণ: পূর্ব পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়ন কার্যক্রমে পশ্চিম পাকিস্তানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। পূর্ব বাংলার সম্পদ ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন করা হলেও পূর্ব অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের তেমন উন্নতি হয়নি। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য স্বাধীনতার আন্দোলনকে তীব্র করে।
৪। সাংস্কৃতিক আধিপত্য: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করার চেষ্টা করে। বাঙালির সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার আকাঙ্ক্ষা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫। ছয় দফা আন্দোলন: ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত এই দাবিগুলো পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হয়েছিল। ছয় দফা আন্দোলন স্বাধীনতার পথকে আরও সুগম করে।
৬। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাঙালি নেতাদের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলা জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং গণআন্দোলনের মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় সরকার। এর ফলে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও শক্তিশালী হয়।
৭। ১৯৭০ সালের নির্বাচন: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অনীহা রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। এই ঘটনা স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
৮। ৭ মার্চের ভাষণ: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করে। এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং মুক্তির সংগ্রামের দিকনির্দেশনা দেন। এটি স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৯। সামরিক দমননীতি: পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক আন্দোলন দমন করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যামূলক অভিযান বাঙালিদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
১০। বাঙালি জাতীয়তাবাদ: দীর্ঘদিনের বৈষম্য, শোষণ ও সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের ফলে বাঙালিদের মধ্যে নিজস্ব জাতিসত্তার চেতনা শক্তিশালী হয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকশিত হয়, যা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।
উপসংহার: স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের ফল। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক আন্দোলন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সফলতা লাভ করে এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়।