- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থবিরতার পেছনে নির্ভরশীলতা তত্ত্ব একটি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। colonial বা উপনিবেশবাদের অবসানের পরও এই দেশগুলো উন্নত বিশ্বের ওপর পুঁজি, প্রযুক্তি ও বাজারের জন্য চরমভাবে নির্ভরশীল। এই পরনির্ভরশীলতাই তাদের স্বাবলম্বী হতে বাধা দিচ্ছে এবং অনুন্নয়নের এক অন্তহীন চক্রে আটকে রাখছে।
নির্ভরশীলতা ও অনুন্নয়নের বহুমাত্রিক দিক:
১। পুঁজির অভাব: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের হার অত্যন্ত কম হওয়ায় তারা সব সময় বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণের ওপর নির্ভর করে। এই আর্থিক নির্ভরশীলতার কারণে তারা নিজেদের স্বাধীন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে না। ফলে অনুন্নয়নের চক্র থেকে বের হওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২। প্রযুক্তির নির্ভরশীলতা: শিল্প ও কৃষি খাতের আধুনিকায়নের জন্য এই দেশগুলোকে উন্নত বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যর্থ হওয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতিবছর বিদেশি প্রযুক্তি আমদানিতে চলে যায়। এই প্রযুক্তিগত দাসত্ব দেশীয় মেধা ও শিল্পের বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
৩। বৈদেশিক ঋণ: অনুন্নত দেশগুলো তাদের বাজেট ঘাটতি পূরণ ও উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করে। এই ঋণের সুদের বোঝা এক সময় জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিরাট অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠিন শর্ত মেনে চলতে গিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়।
৪। অসম বাণিজ্য: আন্তর্জাতিক বাজারে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো মূলত কাঁচামাল রপ্তানি করে এবং তৈরি শিল্পপণ্য আমদানি করে। কাঁচামালের দাম সব সময় কম থাকে এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম থাকে অনেক বেশি। এই বাণিজ্য বৈষম্যের কারণে অনুন্নত দেশগুলো প্রতিনিয়ত অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও শোষিত হচ্ছে।
৫। বহুজাতিক সংস্থা: বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তৃতীয় বিশ্বের সস্তা শ্রম ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে বিপুল মুনাফা লুটে নেয়। এই মুনাফার সিংহভাগই তারা নিজেদের দেশে পাচার করে দেয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে যোগ হয় না। ফলে এই সংস্থাগুলোর আধিপত্য দেশীয় ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিকাশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
৬। মস্তিষ্ক পাচার: অনুন্নত দেশগুলোর যোগ্য, দক্ষ ও উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদ উন্নত জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত উন্নত বিশ্বে পাড়ি জমাচ্ছে। দেশীয় অর্থ ও শ্রমে গড়ে ওঠা এই মেধা দেশের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এই মেধা পাচারের ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো স্থায়ীভাবে দক্ষ নেতৃত্ব ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা হারাচ্ছে।
৭। নব্য-উপনিবেশবাদ: ভৌগোলিক স্বাধীনতা পেলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতি নির্ধারণে এই দেশগুলোর নিজস্ব কোনো স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকে না। এই নব্য-উপনিবেশবাদী ব্যবস্থা অনুন্নত দেশগুলোকে চিরকাল উন্নত বিশ্বের দাস করে রাখছে।
৮। ত্রাণের মানসিকতা: দীর্ঘকাল ধরে বিদেশি সাহায্য ও অনুদান পাওয়ার ফলে এই দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের পরমুখাপেক্ষী মানসিকতা তৈরি হয়। তারা নিজেদের সম্পদ ব্যবহারের চেয়ে বিদেশি ত্রাণের ওপর বেশি ভরসা করতে শুরু করে। এই মানসিকতা জনগণের কর্মস্পৃহা ও জাতীয় আত্মমর্যাদাবোধকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়।
৯। ভোক্তা সংস্কৃতি: উন্নত বিশ্বের অন্ধ অনুকরণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অপচয়মূলক ভোক্তা সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার ঘটছে। দেশের সাধারণ মানুষ উৎপাদনমুখী কাজের চেয়ে বিলাসবহুল বিদেশি পণ্য ক্রয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে দেশীয় মুদ্রার অপচয় ঘটছে এবং স্থানীয় বাজারগুলো বিদেশি পণ্যের দখলে চলে যাচ্ছে।
১০। রাজনৈতিক অস্থিরতা: উন্নত দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অনেক সময় তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ করে। তারা অনেক সময় পুতুল সরকার বসিয়ে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ সস্তায় লুটে নেওয়ার চক্রান্ত করে থাকে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি কোনো টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
১১। শর্তযুক্ত সাহায্য: আন্তর্জাতিক সংস্থা বা উন্নত দেশগুলো যখন কোনো সাহায্য বা ঋণ দেয়, তখন তারা নানা ধরনের কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়। এই শর্তগুলো অনেক সময় স্থানীয় জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী এবং দাতা দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থের অনুকূলে হয়। ফলে এই ধরনের সাহায্য অনুন্নয়ন দূর করার চেয়ে পরনির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
১২। একক রপ্তানি: তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশ কেবল এক বা দুটি নির্দিষ্ট প্রাথমিক পণ্যের রপ্তানির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে সেই পণ্যের দাম সামান্য পড়ে গেলেই পুরো দেশের অর্থনীতিতে ধস নেমে আসে। রপ্তানি খাতের এই বৈচিত্র্যহীনতা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে সব সময় এক চরম ঝুঁকির মধ্যে রাখে।
১৩। ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষা: এই দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা উন্নত বিশ্বের আদলে তৈরি হলেও তা স্থানীয় কর্মসংস্থানের উপযোগী নয়। তাত্ত্বিক শিক্ষার আধিক্যের কারণে বিপুল পরিমাণ শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হচ্ছে যারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে না। কারিগরি ও বাস্তবমুখী শিক্ষার অভাব এই দেশগুলোকে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে পিছিয়ে রাখছে।
১৪। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন: স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের সংস্কৃতি অনুন্নত দেশগুলোর ওপর মারাত্মকভাবে চেপে বসছে। এর ফলে স্থানীয় ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও দেশীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব সংস্কৃতির এই অবক্ষয় পরোক্ষভাবে বিদেশি পণ্যের বাজার তৈরিতে বিশাল সহায়তা করে থাকে।
১৫। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে বিদেশি কোম্পানির জন্য পণ্য তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রম করলেও তাদের মজুরি অত্যন্ত কম দেওয়া হয়। মূল লভ্যাংশ বিদেশি মালিকদের পকেটে চলে যাওয়ায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে না।
১৬। কাঠামোগত দুর্বলতা: ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা অনুন্নত অবকাঠামো এখনো এই দেশগুলোর অগ্রগতির প্রধান বাধা। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য তাদের আবার সেই বিদেশি পুঁজির মুখাপেক্ষী হতে হয়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার সঠিক ও সুষম বিকাশ ঘটে না।
১৭। নীতিমালার অভাব: স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের কঠোর ও বাস্তবমুখী নীতিমালা প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে। বিদেশি শক্তির চাপে বা স্থানীয় আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির কারণে সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। এই নীতিগত দুর্বলতা ও দূরদর্শিতার অভাব অনুন্নয়নকে আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
১৮। খাদ্য ঘাটতি: অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশ কৃষিপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও খাদ্য সুরক্ষার জন্য উন্নত দেশের আমদানির ওপর নির্ভর করে। নগদ অর্থকরী ফসল উৎপাদনের চক্করে পড়ে তারা প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে অবহেলা করে থাকে। এই খাদ্য নির্ভরশীলতা দেশের সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক বাজারে চরমভাবে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, নির্ভরশীলতা কেবল একটি অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং এটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সার্বিক মুক্তির প্রধান অন্তরায়। উন্নত বিশ্বের শোষণের বেড়াজাল এবং অভ্যন্তরীণ নীতিহীনতা এই অনুন্নয়নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। যতদিন না এই দেশগুলো নিজেদের সম্পদ ও মেধার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হতে পারবে, ততদিন তাদের প্রকৃত উন্নয়ন ও মুক্তি অসম্ভব।