- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা:বিংশ শতাব্দীর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে জোসেফ স্ট্যালিন এবং লিওন ট্রটস্কির মধ্যকার আদর্শগত দ্বন্দ্ব এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়। লেলিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্ব এবং কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ পথরেখা নিয়ে এই দুই নেতার মধ্যে যে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছিল, তা সমাজতন্ত্রের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।
১। এক দেশে সমাজতন্ত্র: স্ট্যালিনের মূল নীতি ছিল প্রথমে কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, চারপাশের পুঁজিবাদী বিশ্বকে উপেক্ষা করেও একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক দুর্গ গড়ে তোলা সম্ভব। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং দ্রুত শিল্পায়নের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, আগে নিজেদের ঘর গোছানোই ছিল প্রধান কাজ।
২। নিরন্তর বিপ্লব তত্ত্ব: ট্রটস্কি স্ট্যালিনের এই ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ নীতিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, পুঁজিবাদী বিশ্বের বৈরিতার মুখে বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। তাই তিনি বিশ্বজুড়ে অবিরাম বা নিরন্তর বিপ্লব ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। ট্রটস্কি বিশ্বাস করতেন, আন্তর্জাতিক স্তরে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লব সফল না হলে সোভিয়েত ইউনিয়নও টিকবে না।
৩। শিল্পায়নের গতিপ্রকৃতি: স্ট্যালিন সোভিয়েত ইউনিয়নে অত্যন্ত দ্রুত এবং জোরপূর্বক ভারী শিল্প গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি গ্রামীণ কৃষি খাত থেকে উদ্বৃত্ত সম্পদ এনে তা শিল্পায়নে ব্যবহারের কঠোর নির্দেশ দেন। এর উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর সমকক্ষ হওয়া এবং যেকোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা। তাঁর এই নীতিতে সাধারণ মানুষের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছিল।
৪। কৃষিনীতি ও কালেক্টিভাইজেশন: স্ট্যালিন গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোরপূর্বক যৌথ খামার বা ‘কালেক্টিভাইজেশন’ নীতি প্রয়োগ করেন। তিনি ধনী কৃষক বা কুলাকদের সম্পূর্ণ নির্মূল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কৃষকদের সমস্ত জমি ও গবাদিপশু রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসা হয়। এর ফলে সোভিয়েত কৃষিব্যবস্থায় ব্যাপক বিপর্যয় এবং তীব্র দুর্ভিক্ষ দেখা দিলেও স্ট্যালিন তাঁর নীতিতে অটল ছিলেন।
৫। কৃষক শ্রেণির ভূমিকা: ট্রটস্কি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও রাষ্ট্র গঠনে কৃষকদের চেয়ে শহরের শিল্প শ্রমিকদের ওপর বেশি ভরসা করতেন। তিনি মনে করতেন, কৃষকরা স্বভাবগতভাবেই কিছুটা রক্ষণশীল এবং জমির মালিকানার প্রতি আসক্ত থাকে। তাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হতে হবে কেবল সচেতন শ্রমিক শ্রেণি। কৃষকদের তিনি বড়জোর বিপ্লবের সহযোগী শক্তি হিসেবে দেখতেন, মূল নেতা হিসেবে নয়।
৬। আমলাতন্ত্রের বিকাশ: স্ট্যালিনের শাসনামলে সোভিয়েত ইউনিয়নে একটি শক্তিশালী এবং কঠোর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম হয়। সমস্ত ক্ষমতা দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং স্ট্যালিনের নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। দল ও রাষ্ট্রের এই আমলাতন্ত্রীকরণকে স্ট্যালিন স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় মনে করতেন। এর ফলে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
৭। আমলাতন্ত্রের তীব্র বিরোধিতা: ট্রটস্কি সোভিয়েত ইউনিয়নের এই ক্রমবর্ধমান আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি স্ট্যালিনের এই শাসনকে ‘শ্রমিক রাষ্ট্রের বিকৃতি’ বা ‘বঞ্চনাকারী আমলাতন্ত্র’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, আমলাতন্ত্রের আধিপত্য বিপ্লবের মূল চেতনাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তিনি দলে এবং রাষ্ট্রে প্রকৃত শ্রমিক গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার দাবি জানিয়েছিলেন।
৮। দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র: স্ট্যালিনের অধীনে কমিউনিস্ট পার্টিতে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত বা সমালোচনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। দলের সিদ্ধান্ত সবাইকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হতো, যা ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র নামে চালানো হতো। ভিন্নমতাবলম্বীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো এবং দলে কোনো উপদল বা ‘ফ্যাকশন’ তৈরি করতে দেওয়া হতো না। এর ফলে দলের ভেতরে খোলামেলা আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
৯। মত প্রকাশের স্বাধীনতা: ট্রটস্কি কমিউনিস্ট পার্টির ভেতরে মুক্ত আলোচনা এবং সমালোচনার অধিকারের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দলের ভেতরে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না থাকলে সমাজতন্ত্রের সঠিক বিকাশ সম্ভব নয়। স্ট্যালিন যেভাবে ভিন্নমত দমন করছিলেন, ট্রটস্কি তাকে একনায়কতন্ত্র বলে নিন্দা করেন। তিনি পার্টিতে পূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার দাবি জানান।
১০। আন্তর্জাতিক কমিন্টার্নের ভূমিকা: স্ট্যালিন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট সংস্থাকে (কমিন্টার্ন) প্রধানত সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট দলগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করা হতো। স্ট্যালিনের কাছে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের চেয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
১১। বিশ্ব বিপ্লবের নেতৃত্ব: ট্রটস্কি কমিন্টার্ন বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে বিশ্বজুড়ে খাঁটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, এই সংস্থার কাজ সোভিয়েত ইউনিয়নের দালালি করা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদবিরোধী লড়াইকে চাঙ্গা করা। স্ট্যালিনের নীতির কারণে কমিন্টার্ন তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে ট্রটস্কি তীব্র সমালোচনা করেন।
১২। শ্রমিকদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ: স্ট্যালিনের ব্যবস্থায় কারখানাগলোর নিয়ন্ত্রণ শ্রমিকদের হাত থেকে চলে যায় রাষ্ট্র নিযুক্ত আমলাদের কাছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সাধারণ শ্রমিকদের ছিল না। রাষ্ট্রই নির্ধারণ করত কে কতটুকু কাজ করবে এবং কী পাবে। এর ফলে তাত্ত্বিকভাবে শ্রমিকদের রাষ্ট্র বলা হলেও বাস্তবে শ্রমিকরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল।
১৩। শ্রমিক কাউন্সিলের ক্ষমতা: ট্রটস্কি কারখানায় আমলাদের পরিবর্তে সরাসরি শ্রমিকদের কাউন্সিল বা ‘সোভিয়েত’-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, উৎপাদন ব্যবস্থার মূল সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের নিজেদেরই নিতে হবে। আমলাদের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে খর্ব করে। তাই কারখানায় প্রকৃত শ্রমিক স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল।
১৪। সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ নীতি: স্ট্যালিনের শাসনামলে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর কঠোর রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। সৃষ্টিশীল সব কাজকে ‘সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ’ (Socialist Realism) নামক একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছিল। সাহিত্যিক ও শিল্পীদের বাধ্যতামূলকভাবে স্ট্যালিন ও সোভিয়েত রাষ্ট্রের গুণগান গাইতে হতো। এর বাইরে যেকোনো সৃষ্টিকে বুর্জোয়া বা রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে গণ্য করা হতো।
১৫। সাংস্কৃতিক মুক্ত চিন্তা: ট্রটস্কি শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও দলীয় হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি নিজে একজন সুপণ্ডিত ও লেখক ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে শিল্পকলাকে কোনো রাজনৈতিক ফতোয়া দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিল্পীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা ও সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করতেন, যা স্ট্যালিনের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল।
১৬। জাতীয়তাবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদ: স্ট্যালিন কৌশলগত কারণে সোভিয়েত জনগণের মধ্যে রুশ জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের আবেগকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। একে ‘মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। অন্যদিকে ট্রটস্কি ছিলেন কট্টর আন্তর্জাতিকতাবাদী। তিনি মনে করতেন, সমাজতন্ত্রে জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই এবং শ্রমিকের কোনো নির্দিষ্ট দেশ হতে পারে না।
১৭। বিরোধীদের দমন নীতি: স্ট্যালিন তাঁর ক্ষমতা সুসংহত করতে এবং ভিন্নমত দূর করতে ‘গ্রেট পার্জ’ বা মহামুক্তির নামে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্বাসন নীতি চালান। দলের পুরনো লড়াকু নেতাদেরও রাষ্ট্রদ্রোহী সাজিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রটস্কি এই চরম দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা করে একে বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দেন এবং একে স্ট্যালিনের ব্যক্তিগত স্বৈরাচার হিসেবে চিহ্নিত করেন।
শেষকথা: জোসেফ স্ট্যালিন এবং লিওন ট্রটস্কির এই ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব কেবল দুজনের ব্যক্তিগত ক্ষমতার লড়াই ছিল না, বরং তা ছিল সমাজতন্ত্রের রূপরেখা নির্ধারণের আদর্শিক সংগ্রাম। স্ট্যালিনের বাস্তববাদী ও কঠোর একদেশীয় নীতি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাশক্তিতে পরিণত করলেও তা সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। অন্যদিকে ট্রটস্কির আন্তর্জাতিকতাবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় হলেও তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে তা অবাস্তব প্রমাণিত হয়েছিল। এই দুই নেতার ভিন্ন পথ আজও সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে।