- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাংলাদেশ পুলিশ। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের এই আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা বাঙালি জাতির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান
১। প্রথম প্রতিরোধ: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ শুরু করে, তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। পুলিশ সদস্যরা থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি পাকবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। এটিই ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। এই ঘটনা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
২। অকুতোভয় আত্মত্যাগ: স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই রাজারবাগে শত শত পুলিশ সদস্য দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরেও তারা পিছু হটেননি, বরং বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। তাদের এই রক্তদান সমগ্র দেশের পুলিশ বাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পুলিশের এই মহান আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩। ওয়ারলেস বার্তা: ২৫শে মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ওয়্যারলেস অপারেটর শাহজাহান মিয়া নিজের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি আক্রমণের খবর সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার পাঠানো বার্তার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পুলিশ স্টেশন ও জনগণ পাকবাহিনীর আক্রমণের কথা জানতে পারে। এই তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান দেশের সর্বত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানি বাহিনী পরে তাকে আটক করে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করে।
৪। অস্ত্র সরবরাহ: মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে সাধারণ মানুষের কাছে কোনো আধুনিক অস্ত্র ছিল না। পুলিশ সদস্যরা নিজেদের অস্ত্রাগার ভেঙে সাধারণ মানুষ ও যুবকদের হাতে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল এবং গুলি তুলে দিয়েছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী গঠনে এবং তাদের প্রাথমিক অস্ত্র প্রশিক্ষণে এই সরবরাহ অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল। পুলিশের এই সাহসী পদক্ষেপের কারণেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।
৫। সম্মুখ সমরে: কেবল রাজারবাগেই নয়, দেশের প্রতিটি জেলা ও থানায় পুলিশ সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলের পুলিশ লাইন্সে ব্যাপক প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। তারা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্য এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করেছিলেন। অনেক পুলিশ সদস্য যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে শত্রুদের পরাস্ত করেছিলেন।
৬। গোয়েন্দা তথ্য: যুদ্ধকালীন সময়ে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করতেন। পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান, তাদের চলাচলের রুট এবং স্থানীয় রাজাকারদের কর্মকাণ্ডের খবর পুলিশ গোপনে সংগ্রহ করত। এই তথ্যগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের সফল অপারেশন পরিচালনায় এবং আকস্মিক হামলা এড়াতে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল। নিজের জীবন বাজি রেখে পুলিশ সদস্যরা এই তথ্য আদান-প্রদানের কাজটি নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতেন।
৭। মুজিবনগর সরকার: ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী সরকার তথা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। তৎকালীন ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা এই রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেন। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা প্রদর্শনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
৮। মনস্তাত্ত্বিক প্রেরণা: আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশাল অংশ দেশের পক্ষে অস্ত্র ধরেছে—এই খবরটি সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক সাহস জুগিয়েছিল। পুলিশ বাহিনীর এই দেশপ্রেম ও প্রতিরোধ যুদ্ধ পুরো বাঙালি জাতিকে মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা দিয়েছিল। জনগণ বুঝতে পেরেছিল যে এই যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নয়, এটি একটি গণযুদ্ধ। পুলিশের সক্রিয় অংশগ্রহণ মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং যুদ্ধের গতিকে ত্বরান্বিত করেছিল।
৯। সীমান্ত পারাপার: পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর নির্যাতন থেকে বাঁচতে যখন লাখ লাখ মানুষ ভারতে আশ্রয় নিচ্ছিল, তখন পুলিশ সদস্যরা তাদের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। তারা শরণার্থীদের নিরাপদ পথ দেখিয়ে সীমান্তে পৌঁছে দিতে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের আক্রমণ থেকে শরণার্থীদের রক্ষা করতে পুলিশ সদস্যরা নিজেরা যুদ্ধ করেছেন। তাদের এই মানবিক ও বীরত্বপূর্ণ সহায়তা হাজারো বিপন্ন বাঙালির জীবন রক্ষা করেছিল।
১০। খাদ্য ও রসদ: যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, আশ্রয় এবং রসদ জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নিজেদের রেশন এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করতেন। অনেক পুলিশ স্টেশনকে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ও রসদ ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। অবরুদ্ধ এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের টিকিয়ে রাখতে পুলিশের এই পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত কার্যকর।
১১। স্থানীয় প্রশাসন: অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অনেক পুলিশ সদস্য পাকিস্তানি প্রশাসনের অধীনে বাধ্য হয়ে কাজ করলেও ভেতরে ভেতরে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। তারা স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে দিতেন। পাকিস্তানি অফিসারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যবহার করতেন। এই দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, যা তারা দেশের স্বার্থে করেছিলেন।
১২। গেরিলা যুদ্ধ: থ্রি-নট-থ্রি রাইফেলের ব্যবহার এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে পুলিশ সদস্যরা গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। দেশের বিভিন্ন নদীপথ, জঙ্গল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর অতর্কিত হামলা চালাতেন। তাদের এই আকস্মিক আক্রমণের কারণে পাকিস্তানি সেনারা সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে থাকত। পুলিশের এই গেরিলা কৌশল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে বড় অবদান রেখেছিল।
১৩। চরম মূল্য: স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ১৪ হাজার সদস্য সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে ডিআইজি মামুন মাহমুদ ও এসপি শামসুল হকসহ প্রায় ১,১০০ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হন। দেশের স্বাধীনতার জন্য একটি একক বাহিনী হিসেবে এত বড় আত্মত্যাগের নজির সত্যিই বিরল। তাদের এই মহান আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে অনেককে রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করে।
১৪। যোগাযোগ রক্ষা: যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। পুলিশ সদস্যরা তাদের নিজস্ব যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং বিশ্বস্ত বার্তাবাহকদের মাধ্যমে এই কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতেন। এক অঞ্চলের যুদ্ধের খবরাখবর এবং কমান্ডারের নির্দেশ অন্য অঞ্চলে পৌঁছে দিতে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে মুক্তিবাহিনী অনেক বড় বড় অপারেশন সফলভাবে পরিচালনা করতে পেরেছিল।
১৫। অস্ত্র প্রশিক্ষণ: যুদ্ধের শুরুর দিকে সাধারণ ছাত্র ও যুবকদের অস্ত্র চালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। পুলিশ লাইন্স এবং বিভিন্ন গোপন ক্যাম্পে পুলিশ সদস্যরা এই তরুণদের রাইফেল চালানো ও যুদ্ধকৌশলের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেন। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রাথমিক শিক্ষা পরবর্তীতে ভারতে উন্নত প্রশিক্ষণের সময় যুবকদের খুব সাহায্য করেছিল। দক্ষ জনবল তৈরিতে পুলিশের এই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও কার্যকর।
১৬। চিকিৎসা সহায়তা: যুদ্ধক্ষেত্রে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও পুলিশের বিশেষ অবদান ছিল। তারা বিশ্বস্ত চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করে আহতদের ঔষধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। অনেক সময় পুলিশ লাইন্সের হাসপাতাল বা গোপন আস্তানায় রেখে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থ করে তোলা হতো। এই মানবিক সহায়তা বহু মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচিয়েছিল এবং তাদের পুনরায় যুদ্ধে ফেরার সুযোগ করে দিয়েছিল।
১৭। ক্যাম্প ধ্বংস: দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকাররা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানোর জন্য ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। পুলিশ সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলে এই পাকিস্তানি ক্যাম্পগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দিতেন। তারা রাজাকারদের অস্ত্র কেড়ে নিতেন এবং স্থানীয় এলাকাকে শত্রুমুক্ত রাখতেন। ক্যাম্প ধ্বংসের এই অভিযানগুলো স্থানীয় জনগণের মনে স্বস্তি ও বিজয়ের আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছিল।
১৮। বিজয়ী বেশে: দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বিজয়ের পর পরই পুলিশ সদস্যরা ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর্গঠনে দ্রুত মাঠে নেমে পড়েন। তারা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং লুণ্ঠন রোধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করাতে পুলিশ বাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিল।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান কোনো উপমায় শেষ করার মতো নয়। রাজারবাগের প্রথম বুলেট থেকে শুরু করে বিজয়ের লাল সূর্য ছিনিয়ে আনা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে পুলিশের রক্ত ও ঘাম মিশে আছে। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুলিশ সদস্যদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে। শহীদ পুলিশ ভাইদের এই মহান আত্মত্যাগ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।