- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: “একদেশ সমাজতন্ত্র” তত্ত্বটি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতবাদ, যা ১৯২৪ সালে জোসেফ স্তালিন প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অপেক্ষা না করেও একটি দেশে, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নে, স্বাধীনভাবে সমাজতন্ত্র নির্মাণ সম্ভব। লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত নেতৃত্বে যে তাত্ত্বিক বিতর্ক শুরু হয়, তার মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এই তত্ত্বের মূল বিষয়বস্তু কী ছিল।
“একদেশ সমাজতন্ত্র” তত্ত্বটির ব্যাখ্যা:
“একদেশ সমাজতন্ত্র” তত্ত্বটি মূলত বলে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো একটি দেশে, অন্যান্য দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার আগেই, অভ্যন্তরীণ শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। স্তালিনের মতে সোভিয়েত শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতা দখল করার পর সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে কৃষক শ্রেণীকে সাথে নিয়ে একটি সম্পূর্ণ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, যদিও এর জন্য পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বিপ্লবের প্রয়োজন নেই। তবে তিনি এও স্বীকার করেন যে সমাজতন্ত্রের “চূড়ান্ত বিজয়” তখনই সম্ভব যখন একাধিক দেশে প্রলেতারিয়েতের বিপ্লব ঘটবে, কারণ ততক্ষণ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ ও পুঁজিবাদ পুনরুদ্ধারের ঝুঁকি থেকে যাবে। এই তত্ত্বটি সোভিয়েত রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের চেয়ে অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতিগত ভিত্তি তৈরি করে।
এই তত্ত্বের বিপরীতে ছিল লিওন ত্রোৎস্কির “চিরস্থায়ী বিপ্লব” তত্ত্ব, যেখানে তিনি যুক্তি দিতেন যে রাশিয়ার মতো পশ্চাৎপদ দেশে একা সমাজতন্ত্র টিকতে পারবে না এবং পশ্চিম ইউরোপের উন্নত দেশগুলোতে বিপ্লব ছাড়া সোভিয়েত বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে যাবে। স্তালিন ও বুখারিন ১৯২৪ সালে যে সময় এই তত্ত্বটি প্রবর্তন করেন, ততদিনে জার্মানি, হাঙ্গেরি ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ১৯১৭-১৯২৩ সালের মধ্যে সংঘটিত কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছিল। এই ব্যর্থতার পটভূমিতে স্তালিন যুক্তি দেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালীকরণের উপর মনোযোগ দিতে হবে, কারণ বিশ্ব বিপ্লবের আশা করে বসে থাকলে সোভিয়েত রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়বে। ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ষষ্ঠ কংগ্রেসে এই তত্ত্বটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বের প্রায় সব কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নে দ্রুত শিল্পায়ন, কৃষি সমবায়করণ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। স্তালিনের মতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে এটি একাধারে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে পারে এবং একই সাথে বাইরের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য নিজেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রমিক শ্রেণীকে অনুপ্রাণিত করবে এবং এভাবেই একদেশ সমাজতন্ত্র বিশ্ব বিপ্লবের বিরোধী নয়, বরং তার সহায়ক। তবে ত্রোৎস্কি ও তাঁর সমর্থকরা এই তত্ত্বকে মার্কসবাদের মূল চেতনার বিরোধী এবং জাতীয়তাবাদী হিসেবে সমালোচনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত বিপ্লবকে বিকৃত করবে বলে তাঁরা সতর্ক করেন।
উপসংহার: সব মিলিয়ে “একদেশ সমাজতন্ত্র” তত্ত্বটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি, যা ১৯২৪ সালে স্তালিন প্রবর্তন করার পর ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত প্রায় সাত দশক ধরে সোভিয়েত রাষ্ট্রের আদর্শিক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে সোভিয়েত নেতৃত্ব বিশ্ব বিপ্লবের স্বপ্নের বদলে বাস্তবসম্মতভাবে নিজ দেশে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পরবর্তীতে দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষি সমবায়করণের মতো বড় বড় কর্মসূচির ভিত্তি তৈরি করে। যদিও এই তত্ত্বটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয় এবং ত্রোৎস্কিবাদীদের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে, তবু এটি বিংশ শতাব্দীর কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ও প্রভাবশালী অধ্যায় হিসেবে থেকে যায়।
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে স্তালিন প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যখন ১৯১৭-১৯২৩ সালের মধ্যে জার্মানি ও হাঙ্গেরিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৯২৮ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ষষ্ঠ কংগ্রেসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রনীতি হয়ে ওঠে। এই তত্ত্বের ভিত্তিতেই ১৯২৮ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয়, যার মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়ন ও কৃষি সমবায়করণের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।