- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশে বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাচীন পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো বিষয়কে একপাক্ষিকভাবে না দেখে তার বিপরীত দিক, পরিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও গবেষণায় এই পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। সত্য উদঘাটনের জন্য যুক্তি ও বিরোধের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করাই এর মূল বৈশিষ্ট্য।
দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি – এর পরিচয়:-
শাব্দিক অর্থ:
‘দ্বান্দ্বিক’ শব্দটি গ্রিক শব্দ “Dialectic” থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো আলোচনা, বিতর্ক বা যুক্তির মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধান। দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো এমন একটি চিন্তাধারা, যেখানে কোনো বিষয়কে তার বিপরীত অবস্থা ও পরিবর্তনের ধারার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।
পরিচয়:
দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো একটি বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো বিষয় বা ঘটনার মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব, বিরোধ এবং পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করা হয়। এই পদ্ধতিতে সাধারণত একটি ধারণা (Thesis), তার বিপরীত ধারণা (Antithesis) এবং উভয়ের সমন্বয়ে নতুন ধারণার সৃষ্টি (Synthesis)—এই তিনটি ধাপের মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়।
সংজ্ঞা:
১। সক্রেটিস (Socrates):
সক্রেটিসের মতে, প্রশ্ন ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের পদ্ধতিই হলো দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
(“Dialectic is a method of discovering truth through questioning and logical discussion.”)
২। প্লেটো (Plato):
প্লেটোর মতে, যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে জ্ঞানের উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর পদ্ধতিই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
(“Dialectic is the process of attaining higher knowledge through reasoned dialogue.”)
৩। হেগেল (G.W.F. Hegel):
হেগেলের মতে, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে একটি ধারণার বিপরীত ধারণার সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে নতুন ও উন্নত ধারণার সৃষ্টি হয়।
(“Dialectic is a process in which contradictions lead to the development of a higher form of thought.”)
৪। কার্ল মার্কস (Karl Marx):
কার্ল মার্কসের মতে, সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তন বোঝার জন্য দ্বন্দ্ব ও বিরোধ বিশ্লেষণের পদ্ধতিই হলো দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
(“Dialectic is a method of understanding social and historical change through contradictions and conflicts.”)
৫। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels):
এঙ্গেলসের মতে, প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার বিকাশে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
(“Dialectics is the science of the general laws of motion and development of nature, society and thought.”)
৬। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary):
অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের একটি পদ্ধতি।
(“Dialectic is a method of examining and discussing ideas in order to discover truth.”)
৭। জন ডিউই (John Dewey):
জন ডিউই-এর মতে, অভিজ্ঞতা ও যুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং নতুন জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিই দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি।
(“Dialectic is a method of inquiry that develops knowledge through experience, reasoning and problem solving.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হলো এমন একটি যৌক্তিক ও বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো বিষয় বা ঘটনার মধ্যে বিদ্যমান বিরোধ, পরিবর্তন ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে নতুন সত্য বা উন্নত ধারণায় পৌঁছানো হয়। এই পদ্ধতিতে যুক্তি, আলোচনা এবং বিপরীত মতের সমন্বয়ের মাধ্যমে জ্ঞান বিকাশ লাভ করে।
উপসংহার: দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি সত্য অনুসন্ধান ও পরিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। এটি কোনো বিষয়কে স্থির নয়, বরং পরিবর্তনশীল ও পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে। দর্শন, সমাজ ও গবেষণার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বাস্তবতা বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাই জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির গুরুত্ব অপরিসীম।