- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: নয়া গণতন্ত্র হলো মাও সে তুং প্রবর্তিত একটি বিপ্লবী তত্ত্ব, যা মূলত চীনের মতো অর্ধ-ঔপনিবেশিক ও অর্ধ-সামন্ততান্ত্রিক দেশে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ দেখায়। এই তত্ত্বটি ১৯৪০ সালে মাওয়ের “অন নিউ ডেমোক্রেসি” প্রবন্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপিত হয় এবং চীনা বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক নয়া গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যগুলো কী কী।
১। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী: নয়া গণতন্ত্রের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কবল থেকে মুক্ত করা এবং জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করা। মাওয়ের মতো দেশে যেখানে বিদেশী শক্তিগুলো অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত, সেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আগে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন অপরিহার্য ছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদ্র বুর্জোয়া ও জাতীয় বুর্জোয়া—এই চার শ্রেণী একজোট হয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং দেশকে স্বাধীন করবে।
২। সামন্ততন্ত্র ধ্বংস: নয়া গণতন্ত্রের আরেকটি মূল লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরে প্রচলিত সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা। চীনের মতো দেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমিদার ও সামন্ত প্রভুরা কৃষকদের শোষণ করে আসছিল, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় ছিল। এই তত্ত্বের মাধ্যমে কৃষকদের জমির মালিকানা দেওয়া, খাজনা ব্যবস্থা বাতিল করা এবং গ্রামীণ সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়।
৩। জনগণের গণতন্ত্র: নয়া গণতন্ত্র বলতে বোঝায় এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণী, রাষ্ট্র ক্ষমতায় অংশীদার হবে। মাওয়ের ভাষায় এটি হলো “জনগণের জন্য গণতন্ত্র” এবং “প্রতিক্রিয়াশীলদের জন্য একনায়কত্ব” এর সমন্বয়। অর্থাৎ যারা দেশের স্বাধীনতা ও উন্নয়নের পক্ষে, তাদের জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার থাকবে, আর যারা সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের সমর্থক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৪। চার শ্রেণীর জোট: নয়া গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চারটি বিপ্লবী শ্রেণীর জোট গঠন, যার মধ্যে রয়েছে শ্রমিক শ্রেণী, কৃষক শ্রেণী, ক্ষুদ্র বুর্জোয়া এবং জাতীয় বুর্জোয়া। মাওয়ের মতে এই চার শ্রেণী একসাথে কাজ করলেই দেশকে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্ত করা সম্ভব। তবে এই জোটে শ্রমিক শ্রেণী ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব অপরিহার্য, কারণ তারাই এই বিপ্লবকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারবে।
৫। সমাজতন্ত্রে উত্তরণ: নয়া গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী ব্যবস্থা নয়, বরং এটি সমাজতন্ত্রে যাওয়ার একটি অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়। মাও স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে পরবর্তীতে সহজেই সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই পর্যায়টি শেষ হলে দেশ সরাসরি সমাজতন্ত্রে প্রবেশ করবে, কোনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে না গিয়ে।
৬। জাতীয় বুর্জোয়াকে অন্তর্ভুক্তি: মার্কসের চিরায়ত তত্ত্বে বুর্জোয়া শ্রেণীকে শ্রমিক শ্রেণীর শত্রু হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু মাওয়ের নয়া গণতন্ত্র তত্ত্বে জাতীয় বুর্জোয়াকে বিপ্লবী জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর কারণ হলো এই শ্রেণীটিও সাম্রাজ্যবাদের শিকার এবং তারা দেশীয় শিল্প ও ব্যবসার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তাদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে এবং দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে।
৭। নতুন সংস্কৃতি গঠন: নয়া গণতন্ত্র কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলারও আহ্বান জানায়। মাওয়ের মতে পুরনো সংস্কৃতি, যা সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত, তাকে বদলে ফেলে এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে যা বিজ্ঞানমনস্ক, গণতান্ত্রিক ও জাতীয় চেতনায় উজ্জীবিত। এই নতুন সংস্কৃতি হবে জনগণের জন্য, জনগণ দ্বারা এবং জনগণের হাতে গড়া।
৮। অর্থনৈতিক উন্নয়ন: নয়া গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ। এই তত্ত্ব অনুযায়ী জমিদারি ব্যবস্থা বাতিল করে কৃষকদের জমির মালিকানা দেওয়া হবে, বড় বড় শিল্প ও ব্যাংক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, তবে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলো ব্যক্তি মালিকানায় থাকতে পারবে। এই মিশ্র অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হবে।
৯। গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব: মাওয়ের নয়া গণতন্ত্র তত্ত্বে “গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব” বা “পিপলস ডেমোক্রেটিক ডিক্টেটরশিপ” নামক একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে বিপ্লবী শ্রেণীগুলো একসাথে ক্ষমতায় থাকবে এবং প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা হবে এবং সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ সুগম হবে।
১০। বিশ্ব বিপ্লবের অংশ: নয়া গণতন্ত্র কেবল চীনের জন্য নয়, বরং এটি বিশ্বের অন্যান্য অর্ধ-ঔপনিবেশিক ও অর্ধ-সামন্ততান্ত্রিক দেশের জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করে। মাওয়ের মতে চীনের বিপ্লব বিশ্ব বিপ্লবের একটি অংশ এবং এটি অন্যান্য দেশের মুক্তি আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করবে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের নিজস্ব শর্তে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ খুঁজে পায়।
উপসংহার: সব মিলিয়ে নয়া গণতন্ত্র হলো মাও সে তুংয়ের একটি অভিনব ও ব্যবহারিক তত্ত্ব, যা চীনের মতো পশ্চাৎপদ দেশে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখায়। এই তত্ত্বের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, চার শ্রেণীর জোট গঠন, গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সমাজতন্ত্রে উত্তরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়। ১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সফল হওয়ার পর এই তত্ত্ব বাস্তবে রূপ নেয় এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে চীন সরাসরি সমাজতন্ত্রে প্রবেশ করে।