- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানবসমাজের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে মার্কসবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ। এটি উনিশ শতকে জার্মান দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কসের চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, উৎপাদন ব্যবস্থা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণে মার্কসবাদ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
মার্কসবাদ হলো একটি সমাজতাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতবাদ, যা সমাজের বিকাশকে মূলত অর্থনৈতিক কাঠামো, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা। মার্কসবাদের মতে, ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রেণিসংগ্রাম এবং পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ও পুঁজিপতি শ্রেণির মধ্যে সংঘাত বিদ্যমান।
‘মার্কসবাদ’ (Marxism) শব্দটি এসেছে কার্ল মার্কস (Karl Marx)-এর নাম থেকে। ইংরেজি Marxism শব্দের অর্থ হলো—কার্ল মার্কসের দর্শন, চিন্তাধারা ও সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্বের সমষ্টি।
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx):
মার্কস সমাজকে উৎপাদন সম্পর্ক ও শ্রেণিসংগ্রামের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, “এ পর্যন্ত বিদ্যমান সকল সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস।”
(“The history of all hitherto existing society is the history of class struggles.”)
২। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels):
এঙ্গেলসের মতে, মার্কসবাদ হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা সমাজের অর্থনৈতিক বিকাশ, শ্রেণি সম্পর্ক এবং ঐতিহাসিক পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে।
(“Marxism is the scientific understanding of the laws of development of human society, based on material conditions and class relations.”)
৩। ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin):
লেনিনের মতে, মার্কসবাদ হলো মার্কসের দর্শন, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
(“Marxism is the system of the views and teachings of Marx, which provides a scientific basis for the socialist movement.”)
৪। জর্জ লুকাচ (Georg Lukács):
লুকাচের মতে, মার্কসবাদ কেবল একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়; এটি সমাজ ও ইতিহাস বোঝার একটি সামগ্রিক পদ্ধতি।
(“Marxism is a method of understanding society and history through the totality of social relations.”)
৫। কার্ল কাউটস্কি (Karl Kautsky):
কাউটস্কির মতে, মার্কসবাদ হলো সমাজের বিকাশ ও পুঁজিবাদের পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
(“Marxism is the scientific study of social development and the transformation of capitalism.”)
৬। রালফ মিলিব্যান্ড (Ralph Miliband):
মিলিব্যান্ডের মতে, মার্কসবাদ হলো এমন একটি বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো যা শ্রেণি, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে।
(“Marxism is an analytical framework for understanding class, state and power relations in society.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, মার্কসবাদ হলো কার্ল মার্কসের প্রবর্তিত একটি বৈজ্ঞানিক সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ক মতবাদ, যা সমাজের পরিবর্তনকে উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। এই মতবাদ পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ও মালিক শ্রেণির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এবং শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রদান করে।
উপসংহার: মার্কসবাদ আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা। এটি সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি, শ্রেণিবিভাজন ও পরিবর্তনের কারণ বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যদিও এর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক চিন্তায় এর গুরুত্ব অপরিসীম।