- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মার্কসবাদ হলো উনিশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিষয়ক মতবাদ, যার প্রবক্তা ছিলেন জার্মান দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কস (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels)। এই মতবাদ সমাজের শ্রেণিবিভাগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে। মার্কসবাদ মূলত শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রদান করে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
১। দ্বন্দ্ববাদী বস্তুবাদ: মার্কসবাদের অন্যতম প্রধান নীতি হলো দ্বন্দ্ববাদী বস্তুবাদ। মার্কস মনে করেন, পৃথিবীর সকল পরিবর্তন বস্তুগত বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল এবং এই পরিবর্তন সংঘটিত হয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মাধ্যমে। মানুষের চিন্তা বা চেতনা নয়, বরং বস্তুগত অবস্থা সমাজের বিকাশকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রকৃতি, সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তন বোঝার জন্য বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই এই নীতির মূল বিষয়।
২। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মার্কসবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। মার্কসের মতে, ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষের অর্থনৈতিক জীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থা। সমাজের উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোরও পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ সমাজের বিকাশ বুঝতে হলে প্রথমে সেই সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে হবে।
৩। শ্রেণি সংগ্রাম: মার্কসবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো শ্রেণি সংগ্রামের ধারণা। মার্কসের মতে, মানব ইতিহাস মূলত শোষক ও শোষিত শ্রেণির মধ্যে সংঘর্ষের ইতিহাস। পুঁজিবাদী সমাজে মালিক শ্রেণি বা বুর্জোয়া শ্রেণি শ্রমিক শ্রেণি বা প্রলেতারিয়েতকে শোষণ করে। এই শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের ফলেই সমাজে পরিবর্তন আসে এবং নতুন সামাজিক ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়।
৪। উদ্বৃত্ত মূল্য: উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব মার্কসের অর্থনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কসের মতে, শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে মূল্য সৃষ্টি করে, তার সম্পূর্ণ অংশ সে মজুরি হিসেবে পায় না। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ও শ্রমিকের প্রাপ্ত মজুরির মধ্যকার পার্থক্যই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য, যা পুঁজিপতি লাভ হিসেবে গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়াকেই মার্কস শ্রমিক শোষণের প্রধান কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
৫। পুঁজিবাদ বিরোধিতা: মার্কসবাদ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদে সম্পদের মালিকানা কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং অধিকাংশ শ্রমিক শোষণের শিকার হয়। এই ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং শ্রেণিগত বিভেদ তৈরি হয়। তাই মার্কসবাদ একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলে।
৬। সমাজতান্ত্রিক সমাজ: মার্কসবাদের লক্ষ্য হলো একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মার্কসের মতে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হবে এবং শ্রেণিগত বৈষম্য কমে যাবে। এই সমাজে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৭। শ্রমিক শ্রেণির ভূমিকা: মার্কসবাদের মতে, সমাজ পরিবর্তনের প্রধান শক্তি হলো শ্রমিক শ্রেণি বা প্রলেতারিয়েত। মার্কস বিশ্বাস করতেন, শ্রমিক শ্রেণি ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে এবং নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। শ্রমিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠিত আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মার্কস মনে করেন।
৮। শ্রেণিহীন সমাজ: মার্কসবাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মার্কসের মতে, সমাজতন্ত্রের পরবর্তী পর্যায়ে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠবে যেখানে শোষক ও শোষিত শ্রেণির বিভেদ থাকবে না। উৎপাদনের উপকরণ সবার কল্যাণে ব্যবহৃত হবে এবং মানুষ সমান অধিকার ও সুযোগ লাভ করবে। এই সমাজকে মার্কস সাম্যবাদী সমাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৯। রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা: মার্কসবাদের মতে, রাষ্ট্র নিরপেক্ষ কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। পুঁজিবাদী সমাজে রাষ্ট্র মূলত পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে বলে মার্কস মনে করেন। তবে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তিত হবে এবং ধীরে ধীরে শ্রেণিবিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা কমে যাবে।
১০। বিপ্লবের ধারণা: মার্কসবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সামাজিক বিপ্লব। মার্কসের মতে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সংকট ও শ্রেণি সংঘাতের ফলে একসময় বিপ্লব সংঘটিত হবে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা গ্রহণ করবে এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। তাই মার্কসবাদে বিপ্লবকে সমাজ পরিবর্তনের একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
উপসংহার: মার্কসবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ, যা সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণি বৈষম্য ও পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করে। এর মূলনীতিগুলো সমাজে ন্যায়, সমতা ও শোষণমুক্ত পরিবেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠেছে। যদিও মার্কসবাদ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে, তবুও আধুনিক সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষণে এর গুরুত্ব এখনো অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।