- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: পুঁজিবাদ কি শুধু কারখানা আর বাজার নিয়েই শেষ? লেনিন বললেন, না। একসময় পুঁজিবাদ বদলে যায়—ছোট প্রতিযোগিতা মরে, বড় দানব জন্মায়। সেই দানবের নাম সাম্রাজ্যবাদ। তিনি একে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর বলেছিলেন কারণ এখানে পুঁজি আর দেশের সীমানা মানে না, পুরো পৃথিবীকে ভাগ করে খায়। সহজ করে বললে, এটা পুঁজিবাদের পূর্ণতা, আবার তার সংকটের চূড়ান্ত রূপ।
১। একচেটিয়া পুঁজি: একচেটিয়া পুঁজি মানে বাজারে কয়েকটি বিশাল কোম্পানি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আগে ছোট কারখানাগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। পরে বড়রা ছোটদের গিলে ফেলে। ব্যাংক ও শিল্প এক হয়ে যায়। ফলে দাম, উৎপাদন ও মুনাফা কয়েকজনের হাতে চলে যায়। লেনিন দেখালেন, এই একচেটিয়া রূপই সাম্রাজ্যবাদের প্রাণ। প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদ তখন শেষ হয়ে যায় এবং নতুন, আরও লোভী ব্যবস্থা জন্ম নেয়।
২। অর্থ পুঁজি: অর্থ পুঁজি হলো ব্যাংকের টাকা আর শিল্পের পুঁজির মিশ্রণ। ব্যাংক আর শুধু টাকা ধার দেয় না, কারখানার মালিক হয়ে বসে। শিল্পপতিরাও ব্যাংকের ভাগীদার হয়। এভাবে এক ক্ষুদ্র গোষ্ঠী পুরো অর্থনীতি চালায়। লেনিনের মতে, এই অর্থ পুঁজি দেশের ভিতরে মুনাফা বাড়িয়েও তৃপ্ত হয় না। তাই তারা বিদেশে টাকা পাঠায়। সাম্রাজ্যবাদ তাই শুধু সেনাবাহিনীর খেলা নয়, বরং ব্যাংক ও কোম্পানির বিশ্বজয়।
৩। পুঁজি রপ্তানি: পুঁজি রপ্তানি মানে শুধু মাল বেচা নয়, টাকা ও কলকারখানা বিদেশে পাঠানো। উন্নত দেশে মুনাফার হার কমে গেলে পুঁজিপতিরা দরিদ্র দেশে কারখানা, রেল ও খনি খোলে। সেখানে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল পাওয়া যায়। লেনিন বললেন, পণ্য রপ্তানির যুগ শেষ; এখন পুঁজি রপ্তানির যুগ। এই রপ্তানিই উপনিবেশ দখল ও যুদ্ধের আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪। বিশ্ব ভাগাভাগি: বিশ্ব ভাগাভাগি মানে বড় শক্তিগুলো পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার জমি, খনি ও বাজার দখল হয়। যখন ভাগ শেষ হয়ে যায়, নতুন ভাগ চাইলে যুদ্ধ লাগে। লেনিন দেখালেন, সাম্রাজ্যবাদ শুধু বাণিজ্য নয়, সম্পূর্ণ পৃথিবী দখলের ব্যবস্থা। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলেছিলেন।
৫। অসম বিকাশ: অসম বিকাশ মানে সব দেশ একসঙ্গে সমানভাবে এগোয় না। কোনো দেশ হঠাৎ শক্তিশালী হয়, কোনো দেশ পিছিয়ে পড়ে। জার্মানি ইংল্যান্ডকে ধরে ফেলতে চায়, আমেরিকা নতুন করে বাজার চায়। এই অসমতাই সংঘাত তৈরি করে। লেনিনের মতে, পুঁজিবাদের এই অসম গতিই সাম্রাজ্যবাদকে অস্থির ও যুদ্ধপ্রবণ করে তোলে এবং বিপ্লবের সুযোগও তৈরি করে।
৬। পরগাছা চরিত্র: পরগাছা চরিত্র মানে নিজে উৎপাদন না করে অন্যের শ্রম ও সম্পদ চুষে বাঁচা। সাম্রাজ্যবাদী দেশ উপনিবেশ থেকে মুনাফা আনে, নিজ দেশে একদল মানুষ সুদে-ভাড়ায় চলে। শিল্পের প্রাণশক্তি কমে, জুয়া ও ফটকা বাড়ে। লেনিন একে পচনশীল পুঁজিবাদ বলেছিলেন। সর্বোচ্চ স্তর মানে শক্তিও আছে, আবার ভিতরে পচনও আছে।
৭। যুদ্ধের অনিবার্যতা: যুদ্ধের অনিবার্যতা মানে বাজার ও উপনিবেশ নিয়ে সংঘাত এড়ানো যায় না। যখন পৃথিবী ভাগ হয়ে যায়, নতুন ভাগ চাইলে অস্ত্র ছাড়া উপায় থাকে না। লেনিন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখে বললেন, এটা পুঁজিবাদের শান্তিপূর্ণ বিকাশ নয়, তার হিংস্র পরিণতি। তাই সাম্রাজ্যবাদকে তিনি পুঁজিবাদের শেষ ও বিপজ্জনক স্তর হিসেবে চিহ্নিত করলেন।
৮। বিপ্লবের দ্বার: বিপ্লবের দ্বার মানে সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের শেষ দরজা। একচেটিয়া শোষণ, যুদ্ধ ও সংকট মানুষকে বিদ্রোহে ঠেলে দেয়। লেনিন মনে করতেন, এই স্তরে পুঁজিবাদ আর আগের মতো বাঁচতে পারে না। তাই সাম্রাজ্যবাদকে তিনি শুধু অর্থনৈতিক ধাপ নয়, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রাক্কাল বলেছিলেন। সর্বোচ্চ স্তর মানে চূড়ান্ত শক্তি, আবার চূড়ান্ত ভাঙনও।
শেষকথা: লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর বলেছিলেন কারণ এখানে একচেটিয়া পুঁজি, অর্থপুঁজি, পুঁজি রপ্তানি ও বিশ্বদখল একসঙ্গে মিলে যায়। এটি পুঁজিবাদের পূর্ণ বিকাশ, তবু ভিতরে যুদ্ধ ও পচন লুকিয়ে থাকে। আজকের বৈশ্বিক করপোরেট দুনিয়া দেখলেও সেই পুরনো প্রশ্ন ফিরে আসে—শক্তি কি শেষ, না কি নতুন ভাঙনের শুরু