- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ একা বিচ্ছিন্নভাবে উন্নতি করতে পারে না। অর্থনীতি, রাজনীতি, শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই পারস্পরিক সহযোগিতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ঐক্যের ধারণা থেকেই আন্তর্জাতিকতাবাদের জন্ম। এটি এমন একটি মতবাদ যা জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়।
আন্তর্জাতিকতাবাদ বলতে কী বুঝ? — এর পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ:
আন্তর্জাতিকতাবাদ (Internationalism) শব্দটি ইংরেজি “Internationalism” শব্দ থেকে এসেছে। এটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত— Inter অর্থ “মধ্যে বা পারস্পরিক” এবং Nation অর্থ “জাতি বা রাষ্ট্র”। সুতরাং Internationalism-এর শাব্দিক অর্থ হলো “জাতিসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা ও ঐক্যের ধারণা।”
পরিচয়:
আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতা, শান্তি, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই মতবাদ অনুযায়ী মানবজাতির কল্যাণ কেবল একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বের সকল মানুষের উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠাই এর মূল লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিকতাবাদ জাতীয়তাবাদের বিরোধী নয়, বরং এটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সমন্বয় ঘটাতে চায়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ইত্যাদির পেছনে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাব রয়েছে।
বিভিন্ন বিজ্ঞানী, মণীষী ও গবেষকদের সংজ্ঞা:
১। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary):
অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এমন একটি নীতি বা বিশ্বাস যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে।
(“Internationalism is a policy or belief that encourages cooperation and understanding among different nations.”)
২। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte):
কোঁৎ মানব সমাজের ঐক্য ও অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর চিন্তার আলোকে আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো মানবজাতির সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জাতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ধারণা।
(“Internationalism is the idea of cooperation among nations for the progress and welfare of humanity.”)
৩। কার্ল মার্কস (Karl Marx):
মার্কস সরাসরি আন্তর্জাতিকতাবাদের সংজ্ঞা দেননি, তবে তাঁর আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির ধারণা অনুযায়ী এটি হলো বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের ঐক্য ও সহযোগিতার একটি মতবাদ।
(“Internationalism represents the unity and cooperation of working people across nations.”)
৪। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber):
ওয়েবারের রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কিত ধারণার আলোকে আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে নিয়ম, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা।
(“Internationalism is a system based on cooperation, rules, and mutual relations among states.”)
৫। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski):
লাস্কির গণতান্ত্রিক চিন্তার আলোকে আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এমন একটি ধারণা যেখানে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থের পরিবর্তে বিশ্বমানবতার কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়।
(“Internationalism emphasizes global welfare rather than narrow national interests.”)
৬। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington):
হান্টিংটনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষণের আলোকে আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি পদ্ধতি।
(“Internationalism is an approach that promotes cooperation and relations among states.”)
৭। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson):
উইলসন আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার প্রবক্তা ছিলেন। তাঁর চিন্তার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতার সমর্থন।
(“Internationalism supports international institutions and cooperation to maintain world peace.”)
উপরের বিভিন্ন সংজ্ঞা ও ধারণার আলোকে বলা যায়— আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এমন একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক মতবাদ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতা, শান্তি, পারস্পরিক সম্মান ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপসংহার: আন্তর্জাতিকতাবাদ আধুনিক বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। বর্তমান যুগে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, পরিবেশ সমস্যা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই বিশ্বব্যাপী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিকতাবাদের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।