- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানবসমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য, অধিকারহীনতা ও অসম সুযোগ-সুবিধার বিরুদ্ধে যে চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে, তাকে নারীবাদ বলা হয়। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও দর্শনে নারীবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ হিসেবে বিবেচিত। এটি নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি করে। নারীকে সমাজে সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়ার লক্ষ্যে নারীবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নারীবাদ (Feminism) হলো একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও মতবাদ, যার মূল লক্ষ্য হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা এবং নারীর সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। নারীবাদ মনে করে যে, নারীকে দীর্ঘদিন ধরে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অধীনস্থ অবস্থানে রাখা হয়েছে এবং এই বৈষম্যমূলক কাঠামোর পরিবর্তন প্রয়োজন।
‘নারীবাদ’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Feminism। এটি ল্যাটিন শব্দ “Femina” থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো নারী (Woman)। Feminism শব্দের অর্থ হলো নারীর সমতা, অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে মতবাদ বা আন্দোলন।
১। মেরি উলস্টোনক্রাফট (Mary Wollstonecraft):
মেরি উলস্টোনক্রাফটের মতে, নারীদের শিক্ষা ও যুক্তিবোধের সুযোগ দিলে তারা পুরুষের মতোই স্বাধীন ও সক্ষম হতে পারে। তিনি নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দেন।
(“I do not wish women to have power over men; but over themselves.”)
২। সিমোন দ্য বোভোয়ার (Simone de Beauvoir):
সিমোন দ্য বোভোয়ার মনে করেন, নারী জন্মগতভাবে অধীন নয়; বরং সমাজের কাঠামো তাকে অধীন করে তোলে।
(“One is not born, but rather becomes, a woman.”)
৩। বেটি ফ্রিডান (Betty Friedan):
বেটি ফ্রিডানের মতে, নারীর ব্যক্তিসত্তা, স্বাধীনতা ও সামাজিক ভূমিকার স্বীকৃতি প্রয়োজন। তিনি আধুনিক নারীবাদী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ।
(“Feminism is the struggle for women’s equality and the recognition of women’s full human potential.”)
৪। বেল হুকস (bell hooks):
বেল হুকসের মতে, নারীবাদ হলো এমন একটি আন্দোলন যা লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন ও বৈষম্য দূর করার জন্য কাজ করে।
(“Feminism is a movement to end sexism, sexist exploitation and oppression.”)
৫। জার্মেইন গ্রিয়ার (Germaine Greer):
জার্মেইন গ্রিয়ারের মতে, নারীবাদ নারীর ওপর আরোপিত সামাজিক সীমাবদ্ধতা ও পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে একটি সংগ্রাম।
(“Feminism challenges the traditional roles imposed on women by society.”)
৬। জুডিথ বাটলার (Judith Butler):
জুডিথ বাটলারের মতে, লিঙ্গ পরিচয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নির্মিত হয় এবং নারীবাদ এই নির্মাণকে বিশ্লেষণ করে।
(“Gender is not something one is, it is something one does.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, নারীবাদ হলো এমন একটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক মতবাদ, যা নারী–পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা, নারীর অধিকার রক্ষা এবং পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যমূলক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য কাজ করে। এটি নারীর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন।
উপসংহার: নারীবাদ আধুনিক সমাজে নারী অধিকার ও সমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি শুধু নারীর মুক্তির কথা বলে না, বরং একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ধারণ করে। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারের আলোচনায় নারীবাদের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।