- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: উপস্থাপন অর্থনীতির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটি বিষয় এক মনে হলেও এদের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। একটি দেশের সীমানার মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা কেনা-বেচা হলে তাকে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বলা হয়, আর যখন দুটি বা তার বেশি দেশের মধ্যে এই লেনদেন ঘটে, তখন তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলা হয়। এই নিবন্ধে আমরা এই দুটি বাণিজ্যের মধ্যে থাকা প্রধান পার্থক্যগুলো নিয়ে সহজ ভাষায় আলোচনা করব।
১। বাজারের বিস্তৃতি: একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সেই দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়ই একই দেশের নাগরিক হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একাধিক দেশের মধ্যে বিস্তৃত হয়, যেখানে বিক্রেতা একটি দেশের নাগরিক এবং ক্রেতা অন্য কোনো দেশের নাগরিক হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিধি অনেক বেশি হয় এবং এর জটিলতাও বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের বাজার ছোট হলেও এটি দেশের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করে।
২। মুদ্রা ও বিনিময় হার: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে কেবল একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। এতে মুদ্রার বিনিময় হারের কোনো জটিলতা থাকে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। এর ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারককে তাদের নিজ নিজ মুদ্রাকে অন্য দেশের মুদ্রায় রূপান্তর করতে হয়, যা বিনিময়ের হারের উপর নির্ভরশীল। এই বিনিময় হারের ওঠানামা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
৩। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে একটি দেশের সরকারের নীতি ও আইনের অধীনে পরিচালিত হয়। এতে শুল্ক, কোটা বা অন্য কোনো ধরনের বাণিজ্যিক বাধা খুব কম থাকে। পক্ষান্তরে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক চুক্তি ও নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বাণিজ্যের উপর প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রভাব ফেলে।
৪। পরিবহণ খরচ: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে সাধারণত পরিবহণ খরচ কম হয়, কারণ পণ্য একই দেশের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো হয়। এতে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যায়, যা পরিবহণ খরচকে অনেক বাড়িয়ে তোলে। বিমান, জাহাজ বা রেলপথে পণ্যের পরিবহণ ব্যয়বহুল হওয়ায় এর প্রভাব পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যের উপর পড়ে।
৫। ঝুঁকি ও নিরাপত্তা: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আইনগত ঝুঁকি কম থাকে। যেহেতু লেনদেন একই দেশের মধ্যে হয়, তাই আইনি ব্যবস্থা ও সালিশের সুযোগ সহজে পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশের আইন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চুক্তি লঙ্ঘনের মতো ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংঘাত বা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।
৬। বাজার পরিস্থিতি: অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রেতাদের পছন্দ, চাহিদা এবং জীবনযাত্রার মান সাধারণত একই ধরনের হয়। তাই পণ্যের বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা নির্দিষ্ট বাজারের জন্য উপযোগী হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের সংস্কৃতি, পছন্দ ও চাহিদা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় পণ্যের বৈচিত্র্যও বেশি হয়। এর জন্য উৎপাদনকারীকে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে হয়।
৭। সরকারি নীতি: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে সরকার দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে। যেমন: ভর্তুকি দেওয়া বা নির্দিষ্ট পণ্যের উপর কর কমানো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরকার আমদানি ও রপ্তানি নীতি তৈরি করে, যা অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। এতে শুল্ক আরোপ, কোটা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
৮। আইনি প্রক্রিয়া: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের জন্য একটি দেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক আইন যথেষ্ট। লেনদেন সংক্রান্ত কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা স্থানীয় আদালতের মাধ্যমে সমাধান করা যায়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইন, চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন দেশের আইনের ভিন্নতা থাকায় আইনি জটিলতাও বেশি হয়।
৯। লেনদেনের প্রকৃতি: অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের লেনদেন সাধারণত নগদ, চেক বা ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সহজেই সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেন করার জন্য লেটার অব ক্রেডিট বা ব্যাংক গ্যারান্টির মতো জটিল পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এটি লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, তবে প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
উপসংহার: অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উভয়ই অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য দেশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং বিশ্বায়নের ধারাকে ত্বরান্বিত করে। যদিও এদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, তবুও একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এই দুটি বাণিজ্যের সুষম ব্যবহার অপরিহার্য।
১। বাজারের বিস্তৃতি ২। মুদ্রা ও বিনিময় হার ৩। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ৪। পরিবহণ খরচ ৫। ঝুঁকি ও নিরাপত্তা ৬। বাজার পরিস্থিতি ৭। সরকারি নীতি ৮। আইনি প্রক্রিয়া ৯। লেনদেনের প্রকৃতি।
এই প্রশ্নের আলোকে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১৯৯৪ সালে স্বাক্ষরিত গ্যাট (GATT) চুক্তির মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিও (WTO) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুনকে সহজ ও একীভূত করেছে। এর ফলে দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা কমেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে লেনদেন বেড়েছে। ১৯৩০-এর দশকে গ্রেট ডিপ্রেশন চলাকালীন সময়ে, দেশগুলো একে অপরের উপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, যা থেকে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক নীতি কীভাবে বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।

