- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: আগরতলা মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল। এই মামলা বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ গভীরভাবে রোপণ করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এটি কেবল একটি বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের এক জোরালো কণ্ঠস্বর। এই মামলার প্রতিটি পর্যায়ই বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
আগরতলা মামলার কারণ ও ফলাফল:-
পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক শাসন: তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করত। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ ব্যবহার করে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন করা হতো, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে কোনো উদ্যোগ ছিল না। এই বৈষম্য জনগণের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে, যা আগরতলা মামলার মূল প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
আর্থিক বৈষম্য: পূর্ব পাকিস্তানের পাট, চা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহার করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তেমন কোনো বিনিয়োগ ছিল না, যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অর্থনৈতিক শোষণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং তারা উপলব্ধি করে যে তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন করা হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্যই স্বায়ত্তশাসনের দাবির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এবং আগরতলা মামলার প্রেক্ষাপট তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
রাজনৈতিক বঞ্চনা: পাকিস্তানের রাজনীতিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল নামমাত্র। কেন্দ্রীয় সরকারে পূর্ব পাকিস্তানের প্রভাব ছিল অত্যন্ত সীমিত, এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণে তাদের মতামতকে উপেক্ষা করা হতো। সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনেও পূর্ব পাকিস্তানিদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত নগণ্য। এই রাজনৈতিক বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে হতাশ করে তোলে এবং তারা উপলব্ধি করে যে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বায়ত্তশাসন অর্জন অপরিহার্য। এই রাজনৈতিক পটভূমি আগরতলা মামলার জন্ম দেয় এবং আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে।
ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পাকিস্তানি উদ্যোগের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে। এই আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতি তাদের গভীর ভালোবাসার প্রমাণ দেয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানতে চায়, তখন তা জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষায় তাদের আরও বেশি সচেষ্ট করে তোলে।
স্বায়ত্তশাসনের দাবি: ছয় দফা কর্মসূচী ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত একটি রূপরেখা, যা শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপন করেছিলেন। এই কর্মসূচী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। ছয় দফায় অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি বাদে বাকি সব বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো হয়েছিল। এই ছয় দফা এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে এটি বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব: শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা ছয় দফা আন্দোলনকে গণআন্দোলনে রূপান্তর করে। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেন এবং তাদের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত করেন। তার আপোষহীন মনোভাব ও অদম্য সাহস বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরও জোরালো করে। আগরতলা মামলায় জড়িয়ে পড়ার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি বাঙালির হৃদয়ে এক অবিচ্ছেদ্য স্থান করে নেন।
আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ: পাকিস্তানি সরকার শেখ মুজিবুর রহমান ও আরও ৩৪ জন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভারতের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে। এই মামলাটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও এটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট একটি মামলা, তবু পাকিস্তানি সরকার এটিকে ব্যবহার করে শেখ মুজিবকে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল। এই অভিযোগের মাধ্যমে তারা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে।
সামরিক শাসনের কঠোরতা: তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সামরিক শাসন ছিল অত্যন্ত কঠোর ও দমনমূলক। তিনি যে কোনো প্রকার ভিন্নমত দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। এই দমনমূলক নীতি জনগণের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং তাদের মধ্যে প্রতিবাদের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। সামরিক শাসনের অধীনে মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয় এবং জনগণের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত একটি বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয়। আগরতলা মামলা এই সামরিক শাসনের কঠোরতার একটি উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
গণঅভ্যুত্থান: আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্র-জনতা ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও মিছিলের মাধ্যমে এই মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই গণঅভ্যুত্থান এতটাই ব্যাপক আকার ধারণ করে যে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান আগরতলা মামলার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ছিল, যা সরকারের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে এবং মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে।
মামলা প্রত্যাহার: গণঅভ্যুত্থানের তীব্রতা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে পাকিস্তানি সরকার আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। প্রবল জনমতের চাপে আইয়ুব খান এই মামলা থেকে সরে আসতে বাধ্য হন এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনা বাঙালি জাতির এক বিশাল বিজয় ছিল এবং এটি প্রমাণ করে যে ঐক্যবদ্ধ জনশক্তি যেকোনো অন্যায়কে পরাজিত করতে পারে। মামলার প্রত্যাহার বাঙালির মনোবল আরও বাড়িয়ে দেয় এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
শেখ মুজিবের মুক্তি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়। তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন, যা তার প্রতি জনগণের অগাধ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক। এই মামলা তাকে শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তার মুক্তি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত করে।
ছয় দফার গ্রহণযোগ্যতা: আগরতলা মামলার পর ছয় দফা কর্মসূচীর গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পায়। জনগণ উপলব্ধি করে যে ছয় দফাই তাদের মুক্তির একমাত্র পথ। এই কর্মসূচী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি সরকার ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করলেও, জনগণের কাছে এটি ন্যায্য দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ছয় দফার প্রতি জনগণের সমর্থন ভবিষ্যতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
স্বাধীনতার দিকে অগ্রযাত্রা: আগরতলা মামলা এবং এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র করে তোলে। এই ঘটনাগুলো বাঙালি জাতিকে তাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য অনুপ্রাণিত করে। জনগণ বুঝতে পারে যে স্বায়ত্তশাসনই যথেষ্ট নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। এই মামলার ফলাফল স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ ছিল এবং বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে।
সামরিক শাসনের পতন: আগরতলা মামলা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের পতন ঘটে। জনগণের তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এটি ছিল স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত বিজয়ের একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। আইয়ুব খানের পতন পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুত্থানের পথ প্রশস্ত করে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ: আগরতলা মামলার ঘটনা পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো হয় তাদের সঙ্গে যোগ দেয় অথবা জনসমর্থন হারায়। এই মেরুকরণ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেয় এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ: আগরতলা মামলা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশ্ববাসী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর পাকিস্তানি সরকারের দমন-পীড়ন সম্পর্কে জানতে পারে। এই মামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই মামলার ঘটনা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করে, যা বিশ্বের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরে।
জাতীয়তাবাদের বিকাশ: আগরতলা মামলা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ঘটনা বাঙালির মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তীব্র আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করে। তারা নিজেদের একটি আলাদা জাতি হিসেবে ভাবতে শুরু করে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর হয়। এই জাতীয়তাবাদী চেতনা স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে এবং বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে।
ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ভিত্তি: আগরতলা মামলা ভবিষ্যতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই মামলার অভিজ্ঞতা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে শিক্ষা দেয় যে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই মুক্তির একমাত্র পথ। এটি পরবর্তীকালে ১৯৭০ সালের নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ সুগম করে। এই মামলার প্রতিটি পর্যায়ই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
বিচার ব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব: আগরতলা মামলা পাকিস্তানের বিচার ব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ করে। এই মামলায় ন্যায়বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শেখ মুজিব ও তার সহযোগীদের অভিযুক্ত করা হয়। এই ঘটনা জনগণের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি করে এবং তারা উপলব্ধি করে যে ন্যায়বিচার পেতে হলে তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য লড়তে হবে। এই পক্ষপাতিত্বই জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে।
জনগণের ক্ষমতার প্রকাশ: আগরতলা মামলা প্রমাণ করে যে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ক্ষমতা যেকোনো স্বৈরাচারী শাসনকে পরাজিত করতে পারে। এই মামলায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনই শেখ মুজিব ও তার সহযোগীদের মুক্তি এনে দেয়। এই ঘটনা জনগণের মধ্যে তাদের নিজেদের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে সাহায্য করে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস যোগায়। এটি ছিল জনগণের শক্তির এক মূর্ত প্রতীক।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট: আগরতলা মামলা এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সরাসরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। এই মামলা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত সংগ্রামে নামার জন্য প্রস্তুত করে তোলে। এটি জনগণের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করে যে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা আর সম্ভব নয় এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এই মামলার অভিজ্ঞতা মুক্তি সংগ্রামে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
উপসংহার: আগরতলা মামলা বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এটি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া ছিল না, বরং ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির তীব্র প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। এই মামলা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে এবং তাকে স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আগরতলা মামলার মাধ্যমে বাঙালি জাতি স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে স্বাধীনতার স্বপ্নে ধাবিত হয়, যা অবশেষে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেয়।
- ১। পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক শাসন
- ২। আর্থিক বৈষম্য
- ৩। রাজনৈতিক বঞ্চনা
- ৪। ভাষা আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা
- ৫। স্বায়ত্তশাসনের দাবি
- ৬। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব
- ৭। আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
- ৮। সামরিক শাসনের কঠোরতা
- ৯। গণঅভ্যুত্থান
- ১০। মামলা প্রত্যাহার
- ১১। শেখ মুজিবের মুক্তি ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি
- ১২। ছয় দফার গ্রহণযোগ্যতা
- ১৩। স্বাধীনতার দিকে অগ্রযাত্রা
- ১৪। সামরিক শাসনের পতন
- ১৫। রাজনৈতিক মেরুকরণ
- ১৬। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ
- ১৭। জাতীয়তাবাদের বিকাশ
- ১৮। ভবিষ্যৎ আন্দোলনের ভিত্তি
- ১৯। বিচার ব্যবস্থার পক্ষপাতিত্ব
- ২০। জনগণের ক্ষমতার প্রকাশ
- ২১। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট
১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয় এবং ১৯৬৮ সালের ৬ই জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের গ্রেফতার করা হয়। এই মামলার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল “রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য”। মোট ৩৫ জনকে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের ১৯শে জুন ঢাকা সেনানিবাসে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার শুরু হয়। মামলার প্রধান বিচারক ছিলেন বিচারপতি এস এ রহমান। আগরতলা মামলা চলাকালীন ১৯৬৯ সালের ২০শে জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদউজ্জামান শহীদ হন এবং ২৪শে জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান ঘটে, যা আইয়ুব শাহীর পতন ত্বরান্বিত করে। এই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং শেখ মুজিবসহ সকল অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। এই ঘটনা পাকিস্তানের ইতিহাসে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের প্রথম বড় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত।

