- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য, পরিষেবা এবং মূলধন আদান-প্রদান করা হয়। এটি আধুনিক অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ, যা দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে সাহায্য করে। এই বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতিটি দেশ তার বিশেষত্ব অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে মনোযোগ দিতে পারে এবং এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।
শাব্দিক অর্থে, ‘আন্তর্জাতিক’ মানে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং ‘বাণিজ্য’ মানে কেনা-বেচা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলতে এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের পণ্য ও পরিষেবা লেনদেনকে বোঝায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো এমন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যেখানে দুটি ভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সত্তা (সরকার, কোম্পানি বা ব্যক্তি) নিজেদের মধ্যে পণ্য, পরিষেবা, বা সম্পদ বিনিময় করে। এটি দেশের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে সংঘটিত হয় এবং দেশগুলোকে তাদের নিজেদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানি করতে এবং প্রয়োজনীয় ঘাটতি পণ্য আমদানি করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়।
১। অর্থনীতিবিদ পল আর. ক্রুগম্যান এবং মরিস অবজার্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: “আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো বিভিন্ন দেশের কোম্পানি বা সরকারগুলোর মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বিনিময়।” (International trade is the exchange of goods and services between companies or governments of different countries.)
2। ভি. এম. মিথানি – এর মতে, “বিভিন্ন দেশের মধ্যে বা বিভিন্ন ভৌগলিক সীমানা পেরিয়ে যে বাণিজ্য সংঘটিত হয় তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে।”
৩। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ, তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস’-এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা দেশগুলোকে তাদের নিজ নিজ বিশেষত্ব অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করে এবং উদ্বৃত্ত পণ্য অন্যান্য দেশের কাছে বিক্রি করার সুযোগ দেয়। (International trade is a system that encourages countries to specialize in producing goods where they have an absolute advantage and to sell the surplus to other nations.)
৪। অধ্যাপক হ্যানসন – এর মতে, “বিভিন্ন বিশেষায়িত পণ্য ও সেবা উৎপাদনশীল দেশসমূহের মধ্যকার বিনিময় কার্যই আর্তর্জাতিক বাণিজ্য হিসেবে গণ্য।”
৫। অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো তার ‘অন দ্য প্রিন্সিপলস অফ পলিটিকাল ইকোনমি অ্যান্ড ট্যাক্সেশন’ গ্রন্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে ব্যাখ্যা করেছেন তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্বের মাধ্যমে। এর মতে, দেশগুলো সেইসব পণ্য উৎপাদন করে যা তারা তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করতে পারে এবং সেগুলোর বিনিময়ে অন্য দেশের পণ্য আমদানি করে। (International trade is based on the theory of comparative advantage, where countries produce goods that they can make at a relatively lower cost and import goods from other countries in exchange.)
৬। পিথুলিয়ান ঘোর – এর মতে, “আন্তর্জাতিকভাবে সীকৃত নিয়ম মোতাবেক বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্যদ্রব্যের ক্রয়বিক্রয় কার্যকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে।”
৭। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ চার্লস কিন্ডলবার্গার বলেন, “আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো সেই অর্থনৈতিক কার্যকলাপ যা একটি দেশের সীমানা অতিক্রম করে।” (International trade is the economic activity that crosses a country’s boundaries.)
৮। অধ্যাপক এমোস – এর মতে, “জাতীয় সীমানা পেরিয়ে কোন দ্রব্যের বিনিময় কার্যকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বলে।”
৯। অধ্যাপক পি. ফিফনার ও প্রেসথাস-এর মতে, “আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হচ্ছে বিভিন্ন সার্বভৌম দেশের মধ্যে আর্থিক ও বাণিজ্যিক লেনদেন।” (International trade is the financial and commercial transaction among various sovereign states.)
১০। এম. সি. ভ্যাইশ – এর মতে, “আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হচ্ছে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র বা দেশসমূহের জনসাধারণের মধ্যে দ্রব্য ও সেবার বিনিময়।”
১১। ইকোনমিক লিবার্টি ডিকশনারি অনুযায়ী, “আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বিনিময়, যার ফলে প্রতিটি দেশ তাদের নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে বিশেষত্ব অর্জন করতে পারে।” (International trade is the exchange of goods and services between countries, allowing each to specialize in the production of goods where they have a specific advantage.)
উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য, পরিষেবা, মূলধন, এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞানের আদান-প্রদান, যার মূল লক্ষ্য হলো তুলনামূলক বা নিরঙ্কুশ সুবিধা অর্জন করে প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংহতি বৃদ্ধি করা।
উপসংহার: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু পণ্য আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে এই বাণিজ্যের মাধ্যমে, যা বিশ্বকে একটি ‘বৈশ্বিক গ্রাম’-এ পরিণত করেছে এবং দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার করেছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য, পরিষেবা এবং মূলধন আদান-প্রদানের একটি প্রক্রিয়া।
১৯৫০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ গুণেরও বেশি বেড়েছে, যা বিশ্বায়নের একটি প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) মতে, ২০১৬ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমানে, ইলেকট্রনিক্স, পোশাক এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান তিনটি পণ্য।

