- readaim.com
- 0
উত্তর।।প্রকাকথা: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন। এই দফাগুলো শুধু ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নিয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি ছিল। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের স্বৈরশাসন, অর্থনৈতিক শোষণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই ঐতিহাসিক ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত করেছিল। এটি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১। পাকিস্তানের ফেডারেল পদ্ধতি ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা: ছাত্রদের ১১ দফার প্রথম দাবি ছিল ফেডারেল পদ্ধতির সরকার এবং সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এই দাবি ছিল আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এক সুস্পষ্ট প্রতিবাদ, যা প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে শাসনভার নিশ্চিত করতে চেয়েছিল।
২। স্বায়ত্তশাসন ও আঞ্চলিক ক্ষমতা: দ্বিতীয় দফায় দাবি করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, যা লাহোর প্রস্তাব এবং ঐতিহাসিক ৬ দফার আলোকে প্রণীত হয়েছিল। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া সকল ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানানো হয়, যা অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য ছিল।
৩। ব্যাংক ও মুদ্রানীতি: তৃতীয় দফায় ব্যাংক, মুদ্রা ও আর্থিক নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানানো হয়। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা এবং নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করে অঞ্চলের উন্নয়ন ঘটানো। এটি পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে এক কঠোর প্রতিবাদ ছিল।
৪। শুল্ক ও কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা: চতুর্থ দফায় শুল্ক, কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করার দাবি করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের কর আদায়ের ক্ষমতাকে সীমিত করে প্রাদেশিক সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে প্রদেশের নিজস্ব আয় দ্বারা উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো সম্ভব হতো।
৫। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ: পঞ্চম দফায় বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে ন্যস্ত করার দাবি করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো। এই দফাটি অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য খাতকে উন্নত করতে চেয়েছিল।
৬। প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন: ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা-সামরিক বা প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠনের দাবি করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের সীমিত অংশগ্রহণ এবং অরক্ষিত সীমান্ত পরিস্থিতি এই দাবির জন্ম দেয়। এটি ছিল বাঙালির আত্মরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
৭। শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি: ছাত্রদের ১১ দফার একটি বড় অংশ ছিল শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষার ব্যয় হ্রাস, শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাতিল করার দাবি জানানো হয়। এটি ছাত্রদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন ছিল।
৮। শ্রমিক-কৃষকের মৌলিক অধিকার: অষ্টম দফায় শ্রমিক ও কৃষকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। ন্যায্য মজুরি, ভূমি সংস্কার, কৃষক-শ্রমিকদের ঋণ মওকুফ এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি করা হয়। এটি একটি জনমুখী আন্দোলনের প্রতিফলন ছিল।
৯। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও দমনমূলক আইন বাতিল: নবম দফায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাসহ সকল রাজনৈতিক বন্দির নিঃশর্ত মুক্তি এবং সকল দমনমূলক আইন (যেমন ডিআই রুলস, ১৪৪ ধারা) বাতিল করার দাবি জানানো হয়। এটি ছিল গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
১০। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও জোটনিরপেক্ষতা: দশম দফায় স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জোটনিরপেক্ষ থাকার দাবি করা হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ঝুঁকেছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এই দফা একটি নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের দাবি করেছিল।
১১। প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার ও জনপ্রতিনিধিত্ব: একাদশ দফায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা নিশ্চিত করার দাবি পুনরায় জোর দিয়ে বলা হয়। এটি ছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের মূল ভিত্তি।
সমাপ্ত: ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন ছিল ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি এবং বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক সুস্পষ্ট দলিল। এই দফাগুলো শুধু ছাত্রদের দাবি-দাওয়া নয়, বরং সমগ্র জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বঞ্চনার প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। এই আন্দোলন আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও স্বাধীনতার পথকে সুগম করে। ১১ দফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
- 🏛️ পাকিস্তানের ফেডারেল পদ্ধতি ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা
- 🌐 স্বায়ত্তশাসন ও আঞ্চলিক ক্ষমতা
- 🏦 ব্যাংক ও মুদ্রানীতি
- 💰 শুল্ক ও কর ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা
- 🌍 বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ
- 🛡️ প্যারা-মিলিটারি বাহিনী গঠন
- 📚 শিক্ষাসংক্রান্ত দাবি
- 👨🌾 শ্রমিক-কৃষকের মৌলিক অধিকার
- ⛓️ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি ও দমনমূলক আইন বাতিল
- diplomacy স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও জোটনিরপেক্ষতা
- 🗳️ প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার ও জনপ্রতিনিধিত্ব
ছাত্রদের ১১ দফা কর্মসূচি ৪ জানুয়ারি, ১৯৬৯ সালে গঠিত ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক ঘোষিত হয়। এই পরিষদ মূলত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এই ১১ দফা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফার সঙ্গে ছাত্রদের নিজস্ব দাবি-দাওয়ার সংমিশ্রণ। এই কর্মসূচির ভিত্তিতেই ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, যার ফলস্বরূপ আইয়ুব খানের পতন হয় (২৫ মার্চ, ১৯৬৯) এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান (২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯)। এই আন্দোলনই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করে।

