- readaim.com
- 0
উত্তর।।মুখবন্ধ: জন লকের সম্মতির তত্ত্বটি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, যেকোনো রাষ্ট্রের বৈধতা জনগণের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সম্মতির উপর নির্ভর করে। রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি বিদ্যমান, যেখানে রাষ্ট্র জনগণের অধিকার রক্ষা করবে এবং জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে। এই ধারণাটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী যুক্তি হিসেবে কাজ করে, কারণ এটি শাসককে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে লক ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারের উপর জোর দিয়েছেন।
সম্মতি তত্ত্ব: জন লক (John Locke) ছিলেন একজন ইংরেজ দার্শনিক এবং রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। সপ্তদশ শতকে তার রচিত “Two Treatises of Government” গ্রন্থে তিনি সম্মতির তত্ত্ব (Theory of Consent) নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারণা দেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সরকারের ক্ষমতা জনগণের সম্মতি থেকে আসে। লক মনে করতেন যে, মানুষ প্রাকৃতিক অধিকার নিয়ে জন্মায়, যেমন – জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি। এই অধিকারগুলো রক্ষা করার জন্য মানুষ নিজেদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract) গঠন করে এবং রাষ্ট্র বা সরকার গঠন করে। যদি সরকার এই অধিকারগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণের সেই সরকারকে পরিবর্তন করার অধিকার থাকে।
১। প্রাকৃতিক অবস্থা ও প্রাকৃতিক অধিকার: লক মনে করতেন যে, রাষ্ট্র গঠনের আগে মানুষ একটি প্রাকৃতিক অবস্থায় (State of Nature) বাস করত, যেখানে কোনো সরকার ছিল না। এই অবস্থায় মানুষ সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন ছিল। তবে এই স্বাধীনতার কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রাকৃতিক আইন অনুযায়ী, কারো জীবন, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা বা সম্পত্তি নষ্ট করা যেত না। লক বলেন, প্রতিটি মানুষেরই তিনটি মৌলিক প্রাকৃতিক অধিকার আছে: জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তি। এই অধিকারগুলো জন্মগত এবং কোনো সরকার বা ব্যক্তি এগুলো কেড়ে নিতে পারে না। এই ধারণাটি পরবর্তীকালে মানবাধিকারের ধারণার ভিত্তি তৈরি করে।
২। সামাজিক চুক্তির ধারণা: প্রাকৃতিক অবস্থায় নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য মানুষ নিজেদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তি (Social Contract) করে। এই চুক্তির মাধ্যমে মানুষ তাদের কিছু ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। এই চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য হলো সবার জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা। লক বিশ্বাস করতেন যে, এই চুক্তি কোনো শাসক দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া হয় না, বরং এটি জনগণের স্বেচ্ছায় করা একটি অঙ্গীকার। এই চুক্তির ফলস্বরূপ সরকার বা রাষ্ট্র গঠিত হয়।
৩। সরকার গঠনের উদ্দেশ্য: লকের মতে, সরকার গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জনগণের প্রাকৃতিক অধিকারগুলো রক্ষা করা। প্রাকৃতিক অবস্থায় এই অধিকারগুলো প্রায়শই ঝুঁকির মুখে পড়ত, কারণ সেখানে কোনো কার্যকর বিচার ব্যবস্থা ছিল না। তাই মানুষ একটি নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন এবং আইন প্রয়োগের জন্য সরকার গঠন করে। সরকার হলো জনগণের সেবক, যার দায়িত্ব হলো তাদের জীবনের নিরাপত্তা এবং সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা। যদি সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সরকার তার বৈধতা হারায়।
৪। সম্মতির দুটি রূপ: লক সম্মতির দুটি রূপের কথা বলেছেন: প্রত্যক্ষ সম্মতি (Express Consent) এবং প্রচ্ছন্ন সম্মতি (Tacit Consent)। প্রত্যক্ষ সম্মতি হলো যখন একজন ব্যক্তি স্পষ্টভাবে বা লিখিতভাবে সরকারের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করে। অন্যদিকে, প্রচ্ছন্ন সম্মতি হলো যখন একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, যেমন – রাস্তা ব্যবহার করা, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা ইত্যাদি। লকের মতে, রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বসবাস করা এবং তার সুযোগ-সুবিধা ভোগ করাই প্রচ্ছন্ন সম্মতির প্রমাণ।
৫। সরকারের সীমা: সম্মতির তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি সরকারের ক্ষমতাকে সীমিত করে। যেহেতু সরকারের ক্ষমতা জনগণের সম্মতি থেকে আসে, তাই সরকার জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে পারে না। সরকারের ক্ষমতা চুক্তি দ্বারা সীমাবদ্ধ, এবং এই ক্ষমতা জনগণের অধিকার রক্ষার জন্যই ব্যবহৃত হবে। যদি সরকার তার সীমা অতিক্রম করে, যেমন- জনগণের সম্পত্তি জোর করে দখল করে, তাহলে সেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার জনগণের থাকে। এই ধারণাটি সীমিত সরকারের (Limited Government) ধারণার জন্ম দেয়।
৬। বিপ্লবের অধিকার: লকের তত্ত্ব অনুযায়ী, যদি কোনো সরকার জনগণের জীবন, স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় বা এই অধিকারগুলো হরণ করতে শুরু করে, তাহলে জনগণের সেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার অধিকার আছে। এই অধিকারকে বিপ্লবের অধিকার (Right to Revolution) বলা হয়। লক মনে করতেন যে, এটি কোনো বিশৃঙ্খলার আহ্বান নয়, বরং এটি শেষ উপায় যখন সরকার আর তার দায়িত্ব পালন করে না। এটি সরকারকে তার কাজের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।
৭। সম্পত্তির অধিকারের গুরুত্ব: লক সম্পত্তির অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, একজন ব্যক্তি যখন শ্রমের মাধ্যমে কোনো প্রাকৃতিক বস্তুকে নিজের করে নেয়, তখন সেটি তার সম্পত্তি হয়ে যায়। সরকার এই অধিকারকে রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি মনে করতেন, সম্পত্তির অধিকার মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কোনো ব্যক্তির নিজস্ব সম্পত্তি ছাড়া তার স্বাধীনতা বা জীবন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত হতে পারে না। এই ধারণাটি আধুনিক পুঁজিবাদের ধারণাকে প্রভাবিত করেছে।
৮। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা: লকের মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হলো আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (Legislative Power)। এই ক্ষমতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে থাকে। আইন প্রণয়নকারীরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এবং জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে আইন তৈরি করে। এই আইনগুলো সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে এবং কোনো শাসক তার ঊর্ধ্বে থাকবে না। এই ব্যবস্থা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করে।
৯। ক্ষমতার বিভাজন: লক সরকারের ক্ষমতাকে তিনটি ভাগে ভাগ করার কথা বলেছিলেন: আইন প্রণয়ন (Legislative), শাসন (Executive) এবং ফেডারেল (Federative)। আইন প্রণয়ন বিভাগ আইন তৈরি করবে, শাসন বিভাগ সেই আইন প্রয়োগ করবে এবং ফেডারেল বিভাগ অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করবে। যদিও তার এই বিভাজন আধুনিক ক্ষমতার বিভাজনের (Separation of Powers) মতো ছিল না, তবে এটি ভবিষ্যতের চিন্তাবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
১০। আধুনিক গণতন্ত্রে প্রভাব: লকের সম্মতির তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক শাসনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তার ধারণাগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং সংবিধানের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। জনগণের সার্বভৌমত্ব, সরকারের জবাবদিহি এবং মানবাধিকারের ধারণাগুলো লকের তত্ত্ব থেকে সরাসরি এসেছে। আজ বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নীতিগুলো অনুসরণ করা হয়।
উপসংহার: জন লকের সম্মতির তত্ত্বটি কেবল একটি রাজনৈতিক ধারণা ছিল না, এটি ছিল একটি বিপ্লবী চিন্তা যা স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই তত্ত্বটি দেখায় যে, সরকার তার ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে পায় এবং জনগণের সেবা করাই তার প্রধান লক্ষ্য। যদি সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের সেই সরকারকে পরিবর্তন করার অধিকার থাকে। আধুনিক গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সাংবিধানিক শাসনের পেছনে লকের এই ধারণাটি আজও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
- ❖ প্রাকৃতিক অবস্থা ও প্রাকৃতিক অধিকার
- ❖ সামাজিক চুক্তির ধারণা
- ❖ সরকার গঠনের উদ্দেশ্য
- ❖ সম্মতির দুটি রূপ
- ❖ সরকারের সীমা
- ❖ বিপ্লবের অধিকার
- ❖ সম্পত্তির অধিকারের গুরুত্ব
- ❖ আইন প্রণয়নের ক্ষমতা
- ❖ ক্ষমতার বিভাজন
- ❖ আধুনিক গণতন্ত্রে প্রভাব
লকের সম্মতির তত্ত্বের ধারণাটি ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবকে (Glorious Revolution) প্রভাবিত করে, যা ইংল্যান্ডে রাজা দ্বিতীয় জেমসকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এই বিপ্লবের পর ১৬৮৯ সালে বিল অফ রাইটস (Bill of Rights) প্রণয়ন করা হয়, যা রাজার ক্ষমতা সীমিত করে এবং পার্লামেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। লকের তত্ত্বগুলো ১৭৭৬ সালের মার্কিন স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রেরও (Declaration of Independence) একটি মূল অনুপ্রেরণা ছিল।

