- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: জেন্ডার একটি বহুল আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এটি শুধুমাত্র একটি জৈবিক পরিচয় নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। জেন্ডার নির্ধারণ করে সমাজে আমরা কীভাবে আমাদের ভূমিকা পালন করি, একে অপরের সাথে কেমন আচরণ করি এবং কী ধরনের প্রত্যাশা আমাদের ওপর চাপানো হয়।
শাব্দিক অর্থ: জেন্ডার শব্দটি ইংরেজি ‘gender’ থেকে এসেছে, যার উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ ‘genus’ থেকে। এর অর্থ হলো প্রকার, ধরন বা শ্রেণী।
জেন্ডার বলতে মূলত একজন মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বোঝানো হয়, যা নারী বা পুরুষ হিসেবে তার জৈবিক লিঙ্গ (sex) থেকে আলাদা। সহজ ভাষায়, লিঙ্গ বা সেক্স হলো শারীরিক বৈশিষ্ট্য, যেমন ক্রোমোজোম ও প্রজনন অঙ্গের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত জৈবিক পরিচয়। অন্যদিকে, জেন্ডার হলো সমাজ দ্বারা নির্ধারিত ভূমিকা, আচরণ, দায়িত্ব এবং প্রত্যাশা। সময়ের সাথে সাথে জেন্ডারের ধারণা পরিবর্তন হয় এবং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
সমাজবিজ্ঞানী, নৃতত্ত্ববিদ এবং মনোবিজ্ঞানীরা জেন্ডারকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কিছু উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১। অগবার্ন ও নিমকফ (Ogburn and Nimkoff) বলেন, “জেন্ডার হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেণিবিন্যাস যা নারী ও পুরুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে।”
২। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary) অনুসারে, “জেন্ডার হলো লিঙ্গ পরিচয়ের প্রেক্ষাপটে একজন ব্যক্তির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা।” (The state of being male or female as expressed by social and cultural roles.)
৩। অ্যান ওকেলি (Ann Oakley), একজন ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী, তাঁর ‘Sex, Gender and Society’ বইয়ে জেন্ডারের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, “জেন্ডার হল সাংস্কৃতিক ধারণা এবং সেক্স হল জৈবিক ধারণা।” (Gender is a cultural concept, while sex is a biological one.)
৪। গিলবার্ট (Gilbert) জেন্ডারকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে: “জেন্ডার হলো সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত এবং প্রত্যাশিত আচরণ, ভূমিকা এবং বৈশিষ্ট্য।” (Gender is a set of socially and culturally determined behaviors, roles, and characteristics.)
৫। জুডিথ বাটলার (Judith Butler) তাঁর ‘Gender Trouble’ বইয়ে জেন্ডারকে একটি পারফর্মেটিভ বা অভিনয়মূলক ধারণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, জেন্ডার কোনো নির্দিষ্ট সত্তা নয়, বরং একটি সামাজিক অভিনয়, যা প্রতিনিয়ত পুনরাবৃত্ত হয়। (Gender is a performance, a social enactment that is constantly being repeated.)
৬। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) যদিও সরাসরি জেন্ডার নিয়ে কাজ করেননি, তার সামাজিক স্তরবিন্যাস (social stratification) এর ধারণা জেন্ডার বৈষম্য বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ক্ষমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে যে সামাজিক বিভাজন দেখিয়েছেন, তা জেন্ডার ধারণার সাথে সম্পর্কিত।
৭। কার্ল মার্কস (Karl Marx) সরাসরি জেন্ডার নিয়ে কোনো সংজ্ঞা না দিলেও, তার শ্রেণী-সংগ্রামের (class struggle) ধারণা জেন্ডার বৈষম্যকে অর্থনৈতিক শোষণ ও নিপীড়নের অংশ হিসেবে দেখতে সাহায্য করে।
জেন্ডার হলো একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা নারী এবং পুরুষের জৈবিক পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে তাদের জন্য আলাদা আলাদা আচরণ, ভূমিকা, এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে। এটি শুধুমাত্র শারীরিক নয়, বরং সমাজের মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং প্রত্যাশার উপর নির্ভরশীল একটি ধারণা।
উপসংহার: জেন্ডার একটি জটিল ও বহুমুখী ধারণা, যা শুধুমাত্র নারী-পুরুষের মধ্যে শারীরিক পার্থক্যকে বোঝায় না, বরং সমাজে তাদের অবস্থান, সুযোগ এবং ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। সময়ের সাথে সাথে জেন্ডারের ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে এবং আধুনিক সমাজে এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জেন্ডার কেবল দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত নয়, বরং এটি একটি বর্ণালী বা স্পেকট্রাম।
জেন্ডার হলো সমাজ দ্বারা নির্ধারিত নারী ও পুরুষের ভূমিকা, আচরণ ও বৈশিষ্ট্য।
১৯৬০-এর দশকে দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদী আন্দোলনের সময় জেন্ডার শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। তখন জেন্ডারকে লিঙ্গ থেকে আলাদা একটি সামাজিক ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে জেন্ডার পরিচয় নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৭ সালের একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০% মানুষ মনে করে জেন্ডার কেবল দুটি শ্রেণীতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জেন্ডার পরিচয়ের প্রতি প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্য দেখা যায়।

