- readaim.com
- 0
উত্তর।।মুখবন্ধ: সপ্তদশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক জন লক (John Locke) তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে ‘প্রকৃতির রাজ্য’ (State of Nature) ধারণাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র বা সরকারের আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ এক প্রাকৃতিক অবস্থায় বাস করত। এই অবস্থাটি ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। লকের এই ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং পরবর্তীকালে অনেক দার্শনিকের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছে।
১। প্রাকৃতিক আইন ও অধিকার: লক মনে করতেন, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত ছিল। তিনি এই অধিকারগুলোকে প্রাকৃতিক আইন (Natural Law) দ্বারা প্রদত্ত বলে মনে করতেন। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অপরের জীবন, স্বাধীনতা বা সম্পত্তি কেড়ে নিতে পারত না। এই আইন মানুষের বিবেকবোধ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং এটি ছিল সার্বজনীন ও অমোঘ। লক বিশ্বাস করতেন যে, যুক্তি ও বিবেক দিয়ে মানুষ এই প্রাকৃতিক আইন সম্পর্কে সচেতন হতে পারত এবং এর ভিত্তিতে নিজেদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।
২। স্বাধীনতা ও সমতার ধারণা: লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে সব মানুষই জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং সমান ছিল। এখানে কেউ কারোর অধীন ছিল না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করতে পারত, তবে তা অন্যের অধিকারের ক্ষতি না করে। এই স্বাধীনতা কোনো অবাধ স্বাধীনতা ছিল না, বরং তা ছিল প্রাকৃতিক আইনের দ্বারা সীমিত। এই সমতার ধারণাটি ছিল লকের চিন্তাভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা তিনি তার ‘Two Treatises of Government’ গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
৩। শান্তির রাজ্য: লক হবস-এর (Thomas Hobbes) মতো প্রকৃতির রাজ্যকে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের রাজ্য হিসেবে দেখেননি। তাঁর মতে, এটি ছিল মূলত শান্তি, সদিচ্ছা ও পারস্পরিক সহায়তার একটি অবস্থা। যদিও সেখানে কিছু সমস্যা ছিল, যেমন – বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছিল না, তবে লক মনে করতেন যে মানুষের যুক্তিবাদী আচরণ এই অবস্থাকে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ করে তুলেছিল। বেশিরভাগ মানুষই প্রাকৃতিক আইন মেনে চলত এবং সমাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখত।
৪। সম্পত্তির অধিকার: জন লকের রাজনৈতিক দর্শনে সম্পত্তির অধিকার একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ যখন নিজের শ্রম দিয়ে কোনো কিছু তৈরি করে বা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত কোনো বস্তুকে নিজের কাজে লাগায়, তখন সেই বস্তুর ওপর তার ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অধিকারটি প্রকৃতির রাজ্যেই জন্ম নিয়েছিল এবং এটি প্রাকৃতিক অধিকারের একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। লক মনে করতেন যে, এই অধিকারটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সরকার গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো এই সম্পত্তির অধিকার রক্ষা করা।
৫। বিচার ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা: প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেকেরই প্রাকৃতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য অন্যকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার ছিল। যদি কেউ প্রাকৃতিক আইন ভঙ্গ করে, যেমন – অন্যের জীবন বা সম্পত্তি কেড়ে নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা অন্য যেকোনো ব্যক্তি তাকে শাস্তি দিতে পারত। তবে এই ক্ষমতার প্রয়োগে পক্ষপাতিত্ব এবং আবেগের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা ছিল। কারণ, এখানে কোনো নিরপেক্ষ বিচারক বা আদালত ছিল না। এই সমস্যাটিই পরবর্তীতে রাষ্ট্র গঠনের একটি প্রধান কারণ হয়ে ওঠে।
৬। প্রাকৃতিক আইন প্রয়োগের সমস্যা: যদিও লক প্রকৃতির রাজ্যকে শান্তিপূর্ণ বলে মনে করতেন, তবে সেখানে কিছু মৌলিক সমস্যাও ছিল। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি ছিল প্রাকৃতিক আইন প্রয়োগের। যেহেতু কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ ছিল না, তাই কেউ যদি আইন ভঙ্গ করত, তবে তার বিচার ও শাস্তি দেওয়া হতো ব্যক্তিগতভাবে। এর ফলে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা ছিল। এই অনিশ্চয়তা ও অব্যবস্থাই মানুষকে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র গঠনে উৎসাহিত করে।
৭। রাজনৈতিক সমাজ গঠনের কারণ: প্রকৃতির রাজ্যের অসম্পূর্ণতাগুলোই মানুষকে রাজনৈতিক সমাজ বা রাষ্ট্র গঠনে বাধ্য করে। লকের মতে, মানুষ স্বেচ্ছায় একটি সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়, যার মাধ্যমে তারা তাদের কিছু ক্ষমতা একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকারগুলোকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করা। এই চুক্তি কোনো একক শাসক বা সার্বভৌম ক্ষমতার জন্ম দেয়নি, বরং তা জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন ছিল।
৮। জনগণের সম্মতি: লক বিশ্বাস করতেন যে, যেকোনো বৈধ সরকারের ভিত্তি হলো জনগণের সম্মতি। সরকার তখনই বৈধতা লাভ করে যখন জনগণ স্বেচ্ছায় তার ওপর ক্ষমতা অর্পণ করে। এই সম্মতি হতে পারে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ। এই ধারণার মাধ্যমে লক স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধিতা করেন এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি বলেন, যখন সরকার জনগণের সম্মতি হারায়, তখন জনগণের সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার থাকে।
৯। সীমিত সরকার: সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে গঠিত সরকারের ক্ষমতা ছিল সীমিত। লকের মতে, সরকার শুধু জনগণের প্রাকৃতিক অধিকারগুলো রক্ষা করার জন্যই গঠিত হয়েছিল। সরকার এই অধিকারগুলো কেড়ে নিতে পারত না। যদি সরকার তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তাহলে জনগণের সেই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অধিকার আছে। এই ধারণাটি সাংবিধানিক সরকার এবং সীমিত শাসনের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে।
১০। বিদ্রোহের অধিকার: লকের দর্শনে বিদ্রোহের অধিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি মনে করতেন, যদি কোনো সরকার জনগণের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয় বা এই অধিকারগুলো কেড়ে নিতে চায়, তাহলে জনগণের সেই সরকারকে উৎখাত করে নতুন সরকার গঠনের অধিকার আছে। এই অধিকারটি ছিল জনগণের সার্বভৌমত্বের একটি স্পষ্ট প্রতিফলন এবং এটি আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবের মতো অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
উপসংহার: জন লকের প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কিত ধারণাটি কেবল একটি কাল্পনিক অবস্থা ছিল না, বরং এটি ছিল আধুনিক উদারনীতিবাদ ও গণতন্ত্রের এক শক্তিশালী ভিত্তি। তাঁর মতে, প্রকৃতির রাজ্য মানুষকে স্বাধীনতা, সমতা এবং অধিকারের মূল্য শিখিয়েছিল, এবং সেই অধিকারগুলো সুরক্ষিত করতেই মানুষ রাষ্ট্র বা সরকার গঠন করেছে। লকের এই চিন্তাভাবনা পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক দার্শনিকদের পথ দেখিয়েছে এবং আজও রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকারের আলোচনায় এর প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।
- 👉 প্রাকৃতিক আইন ও অধিকার: মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়।
- 👉 স্বাধীনতা ও সমতার ধারণা: প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং একে অপরের সমান।
- 👉 শান্তির রাজ্য: লকের মতে, প্রকৃতির রাজ্য কোনো বিশৃঙ্খলার রাজ্য নয়, বরং তা ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ।
- 👉 সম্পত্তির অধিকার: শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত কোনো বস্তুর ওপর মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
- 👉 বিচার ও শাস্তি প্রয়োগের ক্ষমতা: প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেকেরই আইন ভঙ্গের জন্য অন্যকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছিল।
- 👉 প্রাকৃতিক আইন প্রয়োগের সমস্যা: কোনো নিরপেক্ষ বিচারক না থাকায় আইন প্রয়োগে পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনা ছিল।
- 👉 রাজনৈতিক সমাজ গঠনের কারণ: প্রাকৃতিক রাজ্যে নিরাপত্তা ও সুবিচারের অভাবই রাষ্ট্র গঠনের মূল কারণ।
- 👉 জনগণের সম্মতি: যেকোনো বৈধ সরকারের ভিত্তি হলো জনগণের সম্মতি।
- 👉 সীমিত সরকার: সরকার জনগণের অধিকার রক্ষা করতে বাধ্য এবং তার ক্ষমতা সীমিত।
- 👉 বিদ্রোহের অধিকার: সরকার যদি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে জনগণের তাকে উৎখাত করার অধিকার আছে।
জন লক ১৬৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৯০ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Two Treatises of Government’ প্রকাশ করেন, যা ইংল্যান্ডের ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের (Glorious Revolution) রাজনৈতিক ভিত্তি প্রদান করেছিল। এই গ্রন্থে তিনি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে সীমিত ও সাংবিধানিক শাসনের পক্ষে যুক্তি দেন। লকের ধারণাবলী ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার (১৭৭৬) মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর কাজগুলো গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের আধুনিক ধারণার জন্ম দিয়েছে।

