- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: বস্তি শব্দটি আমাদের কাছে এক পরিচিত চিত্র তুলে ধরে, যা দারিদ্র্য, নিম্নমানের আবাসন এবং জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতাকে বোঝায়। এটি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও নির্দেশ করে। আধুনিক নগরায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বস্তি সমস্যা। সাধারণত শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে মৌলিক নাগরিক সুবিধা যেমন বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের অভাব থাকে, সেখানেই বস্তি গড়ে ওঠে।
শাব্দিক অর্থ: বস্তি শব্দটি এসেছে ফার্সি ‘বস্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘বসতি’ বা ‘আবাসন’। তবে আধুনিক অর্থে এর ব্যবহার ভিন্ন। এটি সাধারণত অস্বাস্থ্যকর ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বাসস্থানকে বোঝায়।
পরিচয়: বস্তি হলো এমন এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বসতি, যা সাধারণত নগরের প্রান্তিক বা অপরিকল্পিত এলাকায় গড়ে ওঠে। এখানে বসবাসকারী মানুষেরা প্রায়শই সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং তাদের জীবনযাত্রার মান অত্যন্ত করুণ। অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা, যেমন বিদ্যুৎ, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব এই এলাকাগুলোকে আরও দুর্দশাগ্রস্ত করে তোলে। বস্তির ঘরগুলো প্রায়শই বাঁশ, কাঠ, টিন বা পলিথিন দিয়ে তৈরি হয় এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়।
তবে সমাজবিজ্ঞানী ও অন্যান্য গবেষকরা বস্তিকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো
১। অগবার্ন ও নিমকফ (Ogburn and Nimkoff): যদিও তারা সরাসরি বস্তির সংজ্ঞা দেননি, তাদের সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় সামাজিক সমস্যা হিসেবে বস্তির ধারণার প্রতিফলন দেখা যায়। বস্তিকে তারা নগরের একটি অনিয়মিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস বস্তিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের শোষণ করে এবং এই শোষণের ফলস্বরূপ শ্রমিকরা দরিদ্র হয় ও বস্তিতে বসবাস করতে বাধ্য হয়। তিনি বস্তিকে শ্রেণী বৈষম্যের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
৩। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim): ডুর্খেইম বস্তিকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা বা ‘অ্যানোমি’-এর একটি ফলাফল হিসেবে দেখেছেন। যখন সমাজের প্রচলিত নিয়ম-কানুন ভেঙে পড়ে, তখন বস্তির মতো অনানুষ্ঠানিক ও অগোছালো বসতি গড়ে ওঠে, যা সামাজিক সংহতিকে দুর্বল করে তোলে।
৪। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে, বস্তি হলো “a squalid and overcrowded place of living, especially a residential area inhabited by poor people.” (একটি নোংরা ও জনাকীর্ণ বসবাসের স্থান, বিশেষত দরিদ্র মানুষের বসবাসকারী একটি আবাসিক এলাকা)।
৫। জাতিসংঘের প্রোগ্রাম ইউ.এন.-হ্যাবিটেট (UN-HABITAT): এই সংস্থা বস্তিকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে একাধিক বৈশিষ্ট্যর অনুপস্থিতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যেমন – টেকসই আবাসন, পর্যাপ্ত স্থান, নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, এবং দখলের নিরাপত্তা।
৬। লুইস ওয়ার্থ (Louis Wirth): লুইস ওয়ার্থ বস্তিকে নগরের এমন একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যেখানে অনিয়মিত জীবনযাত্রা, সামাজিক সমস্যা এবং অপরাধের হার বেশি।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বস্তিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি: বস্তি হলো কোনো শহুরে এলাকার একটি অংশ যেখানে অপর্যাপ্ত মৌলিক নাগরিক সুবিধা, নিম্নমানের আবাসন ব্যবস্থা এবং তীব্র দারিদ্র্য বিদ্যমান, যা মূলত সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে গড়ে ওঠে।
উপসংহার: বস্তি শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকা নয়, এটি মানব সমাজের এক গভীর সংকট। এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং উন্নয়নের অসম বন্টনের এক করুণ চিত্র। বস্তির সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু আবাসন নির্মাণই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এবং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বস্তি সমস্যা সমাধানে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
বস্তি হলো দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর বসতি, যেখানে মৌলিক নাগরিক সুবিধা অনুপস্থিত।
জাতিসংঘের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে বিশ্বের প্রায় ৮২৮ মিলিয়ন মানুষ বস্তিতে বাস করত। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা ১০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা ২০০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার প্রায় ৪০% মানুষ বস্তিতে বাস করে, যা দেশের নগরায়ন এবং দারিদ্র্যের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে।

