- readaim.com
- 0
উত্তর::প্রস্তাবনা: ব্যবস্থাপনা হলো কোনো কাজ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এই ব্যবস্থাপনা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, তখন তা আরও বেশি দক্ষ ও ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা মূলত প্রচলিত প্রথাগত পদ্ধতির পরিবর্তে যুক্তি ও বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে কাজ করার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোনো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সম্পদ, শ্রম ও সময়কে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
শাব্দিক অর্থ:- বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Scientific Management। এখানে, ‘Scientific’ অর্থ বিজ্ঞানভিত্তিক বা সুশৃঙ্খল এবং ‘Management’ অর্থ পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনা। তাই, শাব্দিকভাবে এর অর্থ হলো বিজ্ঞানসম্মত বা সুশৃঙ্খল পরিচালনা।
বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ঐতিহ্যবাহী বা প্রথাগত ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক নীতি, কৌশল এবং পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে কর্মসম্পাদন করা হয়। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে উৎপাদনশীলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এটিতে প্রতিটি কাজের জন্য আদর্শ সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণ, কর্মীদের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং তাদের কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে পারিশ্রমিক প্রদানের ওপর জোর দেওয়া হয়। এই তত্ত্বের জনক ফ্রেডরিক উইনস্লো টেইলর (Frederick Winslow Taylor), যিনি ১৯১১ সালে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Principles of Scientific Management’-এ এই ধারণাটি প্রথম তুলে ধরেন।
এখানে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। ফ্রেডরিক উইনস্লো টেইলর (Frederick Winslow Taylor): “বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো এইটা সঠিকভাবে জানা যে আপনি মানুষের কাছ থেকে কি করাতে চান এবং এরপর নিশ্চিত করা যে তারা সবচেয়ে ভালো ও সস্তা উপায়ে তা করছে।” (Scientific management is knowing exactly what you want men to do, and then seeing that they do it in the best and cheapest way.)
২। পি. ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): “বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার সমাধান করা।” (Scientific management is the application of scientific method to the solution of institutional problems.)
৩। এল. ডি. হোয়াইট (L. D. White): “বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা মানে হলো প্রতিটি কর্মের জন্য শ্রেষ্ঠ পথ বা উপায় খুঁজে বের করা।” (Scientific management means finding the best way or method for every action.)
৪। উড্র উইলসন (Woodrow Wilson): “সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি কার্যাবলীকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিচালনা করার জন্য একটি সুসংবদ্ধ পদ্ধতিই হলো বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা।” (Scientific management is a systematic approach to conduct every activity of public administration scientifically.)
৫। সাইমন, স্মিথবার্গ ও থাম্পসন (Simon, Smithburg and Thompson): “বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এমন এক ধরনের কর্মপদ্ধতি, যা প্রশাসনের কার্যাবলীকে যুক্তিসঙ্গত ও কার্যকরি করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।” (Scientific management is a work method designed to rationalize and make administrative activities more efficient.)
৬। ডিমক ও ডিমক (Dimock and Dimock): “বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো যেকোনো কাজ দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করার একটি পদ্ধতি।” (Scientific management is a method of accomplishing any task efficiently.)
৭। ডোয়াইট ওয়াল্ডো (Dwight Waldo): “প্রশাসনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো দক্ষতা ও মিতব্যয়িতার একটি প্রক্রিয়া।” (In administration, scientific management is a process of efficiency and economy.)
উপসংহার: উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা হলো একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া, যা বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি ও পদ্ধতির প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানবসম্পদ ও অন্যান্য উপাদানের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। এটি গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তে যুক্তিসঙ্গত ও পরীক্ষামূলক জ্ঞানকে প্রাধান্য দেয়, যা শ্রম ও সম্পদের অপচয় রোধ করে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। এই পদ্ধতি শুধুমাত্র শিল্প ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমাজের সকল ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।
“বিজ্ঞানসম্মত ও বিশ্লেষণধর্মী উপায়ে প্রতিষ্ঠানের কাজ পরিচালনা করার পদ্ধতিই হলো বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা।”
২০১৯ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার নীতি ব্যবহার করে এমন সংস্থাগুলো গড়ে ২০% বেশি উৎপাদনশীলতা অর্জন করেছে। ১৯১০-এর দশকে এর জনপ্রিয়তা বাড়লেও, বর্তমানে এটি আধুনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পদ্ধতির সাথে মিশে গিয়ে আরও শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রায় ৭০% বড় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মপরিচালনায় বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার মৌলিক নীতিগুলোকে কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করছে।

