- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ হলো উৎপাদন ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা কোনো পণ্যের উৎপাদনের পরিমাণ বাড়লে বা কমলে মোট উৎপাদন খরচের পরিবর্তন কীভাবে হয় তা বিশ্লেষণ করে। এটি একটি ফার্ম বা শিল্পের দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই ধারণাটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রণয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
শাব্দিক অর্থ: ‘মাত্রাগত’ (Returns to Scale) শব্দটির অর্থ হলো উৎপাদনের আয়তন বা মাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে মোট উৎপাদনে কী হারে পরিবর্তন হয়, তার পরিমাপ। আর ‘উৎপাদন প্রবাহ’ (Production) মানে হলো উপাদান (Inputs) ব্যবহার করে পণ্য (Outputs) তৈরি করার প্রক্রিয়া। তাই, শাব্দিকভাবে মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ বলতে বোঝায়—উৎপাদনের মাত্রা পরিবর্তনের ফলে মোট উৎপাদনের পরিমাণে যে পরিবর্তন আসে তার অনুপাত বা হার।
অর্থনীতিতে, বিশেষ করে উৎপাদন তত্ত্বে, মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ হলো একটি দীর্ঘমেয়াদী ধারণা । এটি দেখায় যে, যখন কোনো ফার্ম তার উৎপাদনের সমস্ত উপাদান (যেমন: শ্রম, মূলধন, জমি) একই অনুপাতে বৃদ্ধি করে, তখন মোট উৎপাদন (Output) কী হারে পরিবর্তিত হয়। এটি তিনটি প্রধান অবস্থায় বিভক্ত: ক্রমবর্ধমান (Increasing), স্থির (Constant), এবং হ্রাসমান (Decreasing) মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ।
বিভিন্ন বিজ্ঞানী / মণিষী / গবেষক / অধ্যাপকদের প্রদানকৃত সংজ্ঞা:
১।আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall): “যখন কোনো নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ একই অনুপাতে বৃদ্ধি করা হয়, তখন মোট উৎপাদনের বৃদ্ধি যদি উপকরণ বৃদ্ধির অনুপাতের চেয়ে বেশি হয়, তবে তাকে ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন, কম হলে হ্রাসমান মাত্রাগত উৎপাদন এবং সমান হলে স্থির মাত্রাগত উৎপাদন বলে।”
২।পি. এ. স্যামুয়েলসন (P.A. Samuelson): “মাত্রাগত উৎপাদন হলো উৎপাদন অপেক্ষকের এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যা উপকরণগুলোর আনুপাতিক পরিবর্তনের ফলে উৎপাদনের পরিমাণে যে আনুপাতিক পরিবর্তন হয় তা বর্ণনা করে।”
৩।কে. কে. কুরুভিল্লা (K.K. Kuruvilla): “মাত্রাগত উৎপাদন হলো দীর্ঘকালীন সময়ে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের সমানুপাতিক বৃদ্ধির ফলস্বরূপ মোট উৎপাদনের সাপেক্ষে পরিবর্তনের হার।”
৪।আর. জি. লিপসি (R.G. Lipsey): “দীর্ঘ মেয়াদে সমস্ত উপকরণের পরিবর্তন যখন উৎপাদনের মোট পরিমাণে পরিবর্তন ঘটায়, তখন তাকে মাত্রাগত উৎপাদন বলা হয়। এটি উপকরণ ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে হতে পারে।”
৫।ফ্রেডরিক বেনিহাম (Frederic Benham): “দীর্ঘ মেয়াদে একটি ফার্মের উপকরণসমূহের একই অনুপাতে পরিবর্তন করা হলে উৎপাদনে যে পরিবর্তন সাধিত হয়, তাকেই মাত্রাগত উৎপাদন নামে অভিহিত করা হয়।”
৬।সি. ই. ফার্গুসন (C.E. Ferguson): “মাত্রাগত উৎপাদন হলো একটি উৎপাদন অপেক্ষকের বৈশিষ্ট্য, যেখানে সমস্ত উপকরণ একই অনুপাতে বাড়ানো হলে আউটপুট কীভাবে সাড়া দেয় তা দেখানো হয়।”
৭।এ. এল. হ্যারিস (A.L. Harris): “যখন উৎপাদন প্রতিষ্ঠান তার আয়তন বৃদ্ধি করে অর্থাৎ সকল উপকরণ একই অনুপাতে বাড়ায়, তখন যে হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, তাই হলো মাত্রাগত উৎপাদন।”
দীর্ঘমেয়াদে কোনো ফার্ম যখন তার উৎপাদনের সবকটি উপাদান একই অনুপাতে বৃদ্ধি করে, তখন মোট উৎপাদনের পরিমাণে যে আনুপাতিক পরিবর্তন হয়, তাকেই মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ বলা হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, আয়তন বৃদ্ধির ফলে ফার্মটি ক্রমবর্ধমান, স্থির নাকি হ্রাসমান হারে দক্ষতা অর্জন করছে।
উৎপাদনের উপকরণের পরিবর্তনের হারের সাথে মোট উৎপাদনের পরিবর্তনের হারের ওপর ভিত্তি করে মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:
১।ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন: যখন উৎপাদনের সমস্ত উপকরণ যে হারে বাড়ানো হয়, মোট উৎপাদন যদি তার চেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন বলে।
- উদাহরণ: যদি কোনো কারখানায় শ্রম ও মূলধন ১০% বৃদ্ধি করার ফলে মোট উৎপাদন ১৫% বৃদ্ধি পায়, তবে তাকে ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন বলা হবে।
- কারণ: এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন – প্রযুক্তিগত উন্নতি, শ্রম বিভাজনের সুবিধা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং मोठ्या আকারের উৎপাদনের ফলে প্রাপ্ত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।
২।স্থির মাত্রাগত উৎপাদন: উৎপাদনের সকল উপকরণ যে হারে বৃদ্ধি করা হয়, উৎপাদনও যদি ঠিক একই হারে বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে স্থির মাত্রাগত উৎপাদন বলা হয়।
- উদাহরণ: যদি শ্রম ও মূলধন ১০% বৃদ্ধি করার ফলে উৎপাদনও ঠিক ১০% বৃদ্ধি পায়, তবে সেটি স্থির মাত্রাগত উৎপাদনের উদাহরণ।
কারণ: এক্ষেত্রে উৎপাদনের আকার পরিবর্তনের ফলে নতুন কোনো অতিরিক্ত সুবিধা বা অসুবিধা তৈরি হয় না। উৎপাদনের প্রতিটি ইউনিট একই দক্ষতার সাথে উৎপাদিত হতে থাকে।
৩।ক্রমহ্রাসমান মাত্রাগত উৎপাদন: যখন উৎপাদনের সকল উপকরণ যে হারে বাড়ানো হয়, উৎপাদন যদি তার চেয়ে কম হারে বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে ক্রমহ্রাসমান মাত্রাগত উৎপাদন বলে।
- উদাহরণ: শ্রম ও মূলধন ১০% বৃদ্ধি করার ফলে যদি উৎপাদন মাত্র ৫% বৃদ্ধি পায়, তাহলে তাকে ক্রমহ্রাসমান মাত্রাগত উৎপাদন বলে।
- কারণ: সাধারণত অতিরিক্ত বড় আকারের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, সমন্বয়ের অভাব, কাঁচামালের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই তিন প্রকার মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ একটি ফার্মের উৎপাদন নীতি নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনের পরিমাণ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার: মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহের ধারণাটি অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার মাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদী খরচের কাঠামো অনুধাবন করার জন্য একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। এটি কেবল তত্ত্বীয় বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কোনো সংস্থার সম্প্রসারণের যৌক্তিকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই বিশ্লেষণ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ব্যবহার করে ব্যবসায়িক নেতারা তাদের উপাদান বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত অপটিমাইজ করতে পারেন, যা শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই এবং লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল গঠনে সহায়ক হয়।
মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ হলো দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের আনুপাতিক পরিবর্তনের সাপেক্ষে মোট উৎপাদনের সাড়াদানের হার।
২০১১ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর এক জরিপে দেখা যায়, উচ্চ-প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পগুলিতে (যেমন: সফটওয়্যার, বায়োটেকনোলজি) ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ বেশি কার্যকর, যেখানে উৎপাদন দ্বিগুণ করলে খরচ একই অনুপাতে না বেড়ে কম হারে বাড়ে। অন্যদিকে, ঐতিহ্যবাহী কিছু শিল্পে (যেমন: কৃষি) হ্রাসমান মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহ দেখা যেতে পারে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক উৎপাদন তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান জটিলতা এবং অটোমেশন বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী মাঝারি আকারের উদ্যোগগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান মাত্রাগত উৎপাদন প্রবাহের প্রবণতা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদনশীলতার উন্নতি নির্দেশ করে।

