- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: শ্রীলংকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা তার সংবিধানিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ফসল। এটি এমন এক মিশ্র শাসনব্যবস্থা যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির শক্তিশালী প্রভাব বিদ্যমান। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পদ্ধতির বিবর্তন ঘটেছে, যা এর প্রকৃতিকে করেছে আকর্ষণীয় ও জটিল। এই নিবন্ধে শ্রীলংকার বর্তমান শাসন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি সহজ ভাষায় তুলে ধরা হবে।
প্রেসিডেন্সিয়াল বৈশিষ্ট্য (১) শ্রীলংকার সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান এবং সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। তিনি শুধু সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দেন না, বরং সংসদ ভেঙে দেওয়া বা সংসদের উপর ভেটো দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও ভোগ করেন। এই ক্ষমতা তাকে একটি শক্তিশালী অবস্থান প্রদান করে, যা সাধারণ সংসদীয় পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়। এই বৈশিষ্ট্যটি শ্রীলংকার শাসনব্যবস্থাকে একটি আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল বা নির্বাহী-প্রেসিডেন্সিয়াল প্রকৃতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সংসদের প্রাধান্য নেই (২) যদিও শ্রীলংকার একটি এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভা বা সংসদ রয়েছে, কিন্তু কার্যত এটি নির্বাহী বিভাগের কাছে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সংসদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও, রাষ্ট্রপতির ভেটো বা সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতার কারণে সংসদের স্বাধীনতা কিছুটা খর্ব হয়। এই ব্যবস্থাটি প্রথাগত সংসদীয় পদ্ধতির বিপরীত, যেখানে আইনসভাই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী থাকে। রাষ্ট্রপতির হাতে থাকা এই আইনি ক্ষমতা সংসদের উপর একটি নিরপেক্ষ প্রভাব বিস্তার করে।
মন্ত্রীসভার ক্ষমতা কম (৩) সংসদীয় ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মন্ত্রীসভার হাতে প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা থাকা। কিন্তু শ্রীলংকায়, মন্ত্রীসভার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী, যিনি রাষ্ট্রপতির প্রতি দায়বদ্ধ। রাষ্ট্রপতি স্বয়ং মন্ত্রীসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এর ফলে মন্ত্রীসভা কার্যত রাষ্ট্রপতির নির্দেশে কাজ করে এবং তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও ক্ষমতা বেশ সীমিত হয়ে পড়ে। এটি একটি দুর্বল সংসদীয় কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
প্রধানমন্ত্রী ভূমিকা গৌণ (৪) প্রথাগত সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীই হলেন সরকারের প্রধান নির্বাহী এবং সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু শ্রীলংকার সংবিধানে, প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা অনেকটা রাষ্ট্রপতির সহায়ক হিসেবে কাজ করে। তাকে অবশ্যই এমন ব্যক্তি হতে হবে যিনি রাষ্ট্রপতির আস্থাভাজন, যদিও তিনি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রপতির নির্দেশিত নীতি বাস্তবায়ন করা, যা তাকে ব্রিটিশ ধাঁচের প্রধানমন্ত্রীর মতো ক্ষমতাশালী হতে বাধা দেয়।
শক্তিশালী এককক্ষ বিশিষ্ট (৫) শ্রীলংকার আইনসভা বা সংসদ হলো এককক্ষবিশিষ্ট (Unicameral)। এর অর্থ হলো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো উচ্চকক্ষ বা দ্বিতীয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। এটি আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুত এবং সরল করে তোলে। তবে এই এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ যেহেতু রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার উপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, তাই এর সার্বভৌমত্ব কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এর ক্ষমতা মূলত আইন প্রণয়ন এবং সরকারের উপর সীমিত নজরদারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতি (৬) শ্রীলংকার সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) এবং আংশিক ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (First-Past-the-Post) পদ্ধতির মিশ্রণে। এই মিশ্রণটি নিশ্চিত করে যে ক্ষুদ্র দলগুলিও সংসদে প্রতিনিধিত্ব পায়, কিন্তু বৃহত্তর দলগুলিও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত আসন লাভ করে। এই পদ্ধতিটি প্রায়শই কোনো একক দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে বাধা দেয়, যার ফলে কোয়ালিশন সরকার বা জোট সরকারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সংবিধান সংশোধন কঠিন (৭) শ্রীলংকার সংবিধান পরিবর্তন করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই কঠোর প্রক্রিয়াটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, যাতে ক্ষমতাসীন দলগুলি সহজেই নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করতে না পারে। এর মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও ভারসাম্য নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আধা-ফেডারেল প্রবণতা (৮) যদিও শ্রীলংকা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র (Unitary State), তবে প্রাদেশিক পরিষদগুলির (Provincial Councils) মাধ্যমে আংশিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে। প্রাদেশিক পরিষদগুলি আঞ্চলিক প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ে ক্ষমতা ভোগ করে। এই বিকেন্দ্রীকরণ কাঠামোটি দেশের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি মেটাতে সহায়ক হয়েছে এবং শাসনব্যবস্থাকে একটি আধা-ফেডারেল রূপ দিয়েছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব (৯) শক্তিশালী প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতার কারণে প্রায়শই রাষ্ট্রপতি এবং সংসদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। যখন রাষ্ট্রপতি এবং সংসদ ভিন্ন রাজনৈতিক দল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তখন নীতি বাস্তবায়ন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। এই দ্বৈত নির্বাহী কাঠামোটি মাঝে মাঝে সরকারের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটায়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা (১০) শ্রীলংকার সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য বিধান রাখা হয়েছে। বিচারপতিদের নিয়োগ এবং অপসারণ প্রক্রিয়া কঠিন করা হয়েছে, যাতে তারা নির্বাহী বিভাগের চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। বিচার বিভাগ সাংবিধানিক আইন এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা শাসন ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে।
দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা (১১) ঐতিহাসিকভাবে, শ্রীলংকার রাজনীতিতে প্রধানত দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট বা দল আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। এই ব্যবস্থাটি সাধারণত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করে, তবে এটি দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক দলের জন্য সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব অর্জন কঠিন করে তোলে। এই দ্বি-দলীয় ব্যবস্থাটি শ্রীলংকার সংসদীয় প্রক্রিয়ার একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য।
জরুরী অবস্থার বিধান (১২) জাতীয় নিরাপত্তা বা গুরুতর অভ্যন্তরীণ সংকটের সময়, রাষ্ট্রপতিকে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংসদকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। যদিও এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তবে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও থাকে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং মৌলিক অধিকারকে সীমিত করতে পারে।
দুর্নীতির উচ্চ প্রভাব (১৩) শ্রীলংকার রাজনীতিতে দুর্নীতি একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রপতির ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা এবং স্বচ্ছতার অভাবের কারণে প্রায়শই সরকার এবং আমলাতন্ত্রে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই সমস্যাটি সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং জনগণের আস্থাকে গুরুত্বরভাবে প্রভাবিত করে, যা সুশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
সামরিক প্রভাবের উপস্থিতি (১৪) গৃহযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস এবং জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে, শ্রীলংকার রাজনীতি এবং প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রভাব মাঝে মাঝে দৃশ্যমান হয়। রাষ্ট্রপতি সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ায় এই প্রভাব আরও বাড়ে। যদিও এটি রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য প্রয়োজনীয়, তবে গণতন্ত্রে সামরিক প্রভাবের উপস্থিতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্র (১৫) শ্রীলংকার রাজনীতিতে অনেক বড় রাজনৈতিক পরিবার বহু দশক ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে। এই পরিবারতন্ত্রের কারণে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিভা ও যোগ্যতার চেয়ে পারিবারিক সংযোগ প্রাধান্য পায়। এটি সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব এবং দলীয় কাঠামোর মধ্যে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা সাধারণ জনগণের জন্য সুযোগ সীমিত করে।
জনগণের সার্বভৌমত্ব (১৬) শ্রীলংকার সংবিধান চূড়ান্তভাবে জনগণের সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্ব আরোপ করে। আইন প্রণয়ন, শাসন এবং বিচার বিভাগের সমস্ত ক্ষমতা জনগণের উপর ন্যস্ত। সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপতি উভয়ই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং তাদের কাছেই দায়বদ্ধ থাকেন। যদিও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রায়শই প্রেসিডেন্সিয়াল বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে, তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়।
মানবাধিকারের গুরুত্ব (১৭) শ্রীলংকার সংবিধানে নাগরিকদের জন্য মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, চলাচলের স্বাধীনতা ইত্যাদি অধিকারগুলি আইনি সুরক্ষা পায়। যদিও অতীতে এই অধিকারগুলির লঙ্ঘন নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, তবে বিচার বিভাগ এবং আন্তর্জাতিক নজরদারি এটিকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার জন্য এই অধিকারগুলি অপরিহার্য।
উপসংহার: শ্রীলংকার সংসদীয় প্রকৃতি এককভাবে বিশুদ্ধ সংসদীয় ব্যবস্থা নয়, বরং এটি প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতা এবং সংসদীয় কাঠামোর এক জটিল মিশ্রণ। শক্তিশালী নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি এবং তুলনামূলকভাবে দুর্বল আইনসভার কারণে এটি একটি আধা-প্রেসিডেন্সিয়াল গণতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত। এই মিশ্রণটি একদিকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিলেও, অন্যদিকে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অস্থিরতা তৈরি করে। ভবিষ্যতে সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে এই দ্বিধাবিভক্ত শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।

