- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মানবসমাজের ইতিহাসে শ্রেণিবিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। কার্ল মার্কস সমাজকে প্রধানত শোষক ও শোষিত শ্রেণিতে বিভক্ত করে দেখিয়েছেন। এই শ্রেণিবিভাগের মধ্যে যাদের নিজস্ব কোনো উৎপাদন উপকরণ নেই এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজেদের শ্রম বিক্রি করতে হয়, তাদের সর্বহারা শ্রেণি বলা হয়।
সর্বহারা শ্রেণি (Proletariat) বলতে সেই শ্রমজীবী শ্রেণিকে বোঝায়, যাদের নিজস্ব কোনো জমি, কারখানা, যন্ত্রপাতি বা উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা নেই। তারা বেঁচে থাকার জন্য তাদের শ্রমশক্তি পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে বিক্রি করে। মার্কসবাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, পুঁজিবাদী সমাজে সর্বহারা শ্রেণি হলো শোষিত শ্রেণি এবং পুঁজিপতি শ্রেণি হলো শোষক শ্রেণি।
‘সর্বহারা’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Proletariat। এটি ল্যাটিন শব্দ “Proletarius” থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো—যে ব্যক্তি সম্পদহীন এবং যার একমাত্র সম্পদ হলো তার শ্রমশক্তি।
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx):
মার্কসের মতে, সর্বহারা শ্রেণি হলো সেই শ্রমিক শ্রেণি, যাদের উৎপাদনের উপকরণের ওপর কোনো মালিকানা নেই এবং যারা শ্রম বিক্রি করে জীবনধারণ করে।
(“The proletarians are the working class who own no means of production and must sell their labour power to survive.”)
২। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels):
এঙ্গেলসের মতে, সর্বহারা শ্রেণি হলো আধুনিক শ্রমিক শ্রেণি, যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন কাজে নিয়োজিত কিন্তু উৎপাদনের উপকরণের মালিক নয়।
(“The proletariat is that class of modern wage labourers who have no means of production of their own and are reduced to selling their labour power.”)
৩। ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin):
লেনিনের মতে, সর্বহারা শ্রেণি হলো এমন একটি সামাজিক শ্রেণি, যারা পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।
(“The proletariat is the class of wage workers who, deprived of the means of production, are forced to sell their labour power.”)
৪। রালফ মিলিব্যান্ড (Ralph Miliband):
মিলিব্যান্ডের মতে, সর্বহারা শ্রেণি হলো সেই শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, যারা উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রম প্রদান করে কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত থাকে।
(“The proletariat refers to those who sell their labour power and lack ownership of productive resources.”)
৫। অ্যান্টোনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci):
গ্রামসির মতে, সর্বহারা শ্রেণি শুধু অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত নয়; তারা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধেও সংগ্রাম করে।
(“The proletariat is a class capable of challenging the economic and ideological domination of the ruling class.”)
৬। এরিক ওলিন রাইট (Erik Olin Wright):
রাইটের মতে, সর্বহারা শ্রেণি হলো এমন একটি শ্রেণি, যারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে কিন্তু উৎপাদনের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখে না।
(“The proletariat consists of people who participate in production but do not control productive assets.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, সর্বহারা শ্রেণি হলো সমাজের সেই শ্রমজীবী শ্রেণি, যাদের উৎপাদনের উপকরণের ওপর কোনো মালিকানা নেই এবং যারা জীবিকা নির্বাহের জন্য নিজেদের শ্রমশক্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়। মার্কসবাদ অনুযায়ী, এই শ্রেণি পুঁজিবাদী সমাজের প্রধান শোষিত শ্রেণি এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
উপসংহার: সর্বহারা শ্রেণি মার্কসবাদী সমাজ বিশ্লেষণের একটি মৌলিক ধারণা। শিল্পায়ন ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে এই শ্রেণির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিসংগ্রাম বোঝার ক্ষেত্রে সর্বহারা শ্রেণির ধারণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।