- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: কার্ল মার্কসের অর্থনৈতিক চিন্তাধারার মধ্যে উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব (Surplus Value Theory) একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মাধ্যমে মার্কস পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শোষণের অর্থনৈতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, শ্রমিকের শ্রম থেকে যে অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি হয়, তার একটি অংশ শ্রমিককে দেওয়া হয় না; বরং পুঁজিপতি তা মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করে। তাই উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ।
উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব–এর পরিচয়:
উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব হলো কার্ল মার্কসের প্রবর্তিত একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব, যার মাধ্যমে তিনি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুনাফার উৎপত্তি ও শ্রমিক শোষণের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেছেন। মার্কসের মতে, শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে মোট মূল্য সৃষ্টি করে, তার মধ্যে শ্রমিকের মজুরি হিসেবে প্রদত্ত অংশের অতিরিক্ত যে মূল্য থাকে, সেটিই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value)। এই অতিরিক্ত মূল্য পুঁজিপতি শ্রেণি লাভ বা মুনাফা হিসেবে আত্মসাৎ করে।
‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Surplus Value।
- Surplus অর্থ হলো—অতিরিক্ত বা অবশিষ্ট।
- Value অর্থ হলো—মূল্য।
অতএব, Surplus Value বলতে বোঝায়—কোনো শ্রমিকের উৎপাদিত মূল্যের সেই অতিরিক্ত অংশ, যা শ্রমিকের প্রাপ্য মজুরির বাইরে থেকে যায় এবং পুঁজিপতি গ্রহণ করে।
১। কার্ল মার্কস (Karl Marx):
মার্কসের মতে, শ্রমিক তার শ্রমশক্তির মাধ্যমে যে মূল্য সৃষ্টি করে এবং শ্রমিককে প্রদত্ত মজুরির মধ্যে যে পার্থক্য থাকে, সেটিই উদ্বৃত্ত মূল্য। এই উদ্বৃত্ত মূল্য পুঁজিপতির মুনাফার মূল উৎস।
(“Surplus value is the difference between the value produced by labour and the wages paid to labour, which is appropriated by the capitalist.”)
২। ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels):
এঙ্গেলসের মতে, শ্রমিকের অবৈতনিক শ্রমের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত মূল্য সৃষ্টি হয়, সেটিই উদ্বৃত্ত মূল্য এবং এটি পুঁজিবাদী শোষণের ভিত্তি।
(“Surplus value represents the unpaid labour of the working class, which forms the basis of capitalist profit.”)
৩। ভ্লাদিমির লেনিন (Vladimir Lenin):
লেনিনের মতে, উদ্বৃত্ত মূল্য হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকদের শোষণের ফল, যেখানে পুঁজিপতি শ্রমিকের উৎপাদিত অতিরিক্ত মূল্য দখল করে।
(“Surplus value is the value created by workers beyond the value of their labour power and appropriated by capitalists.”)
৪। রালফ মিলিব্যান্ড (Ralph Miliband):
মিলিব্যান্ডের মতে, উদ্বৃত্ত মূল্য ধারণাটি পুঁজিবাদী সমাজে শ্রম ও পুঁজির মধ্যে অসম সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করে।
(“The concept of surplus value explains the unequal relationship between labour and capital in capitalist society.”)
৫। ডেভিড হার্ভে (David Harvey):
ডেভিড হার্ভের মতে, উদ্বৃত্ত মূল্য হলো পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকের উৎপাদিত অতিরিক্ত সম্পদ, যা পুঁজি সঞ্চয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়।
(“Surplus value is the excess value generated by labour and used for the accumulation of capital.”)
৬। জর্জ লুকাচ (Georg Lukács):
লুকাচের মতে, উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব পুঁজিবাদী সমাজের শ্রেণিগত সম্পর্ক ও শোষণের প্রকৃতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
(“Surplus value theory reveals the class relations and mechanisms of exploitation in capitalism.”)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব হলো এমন একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব, যার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে শ্রমিক তার শ্রমের মাধ্যমে যে মোট মূল্য সৃষ্টি করে, তার একটি অংশ মজুরি হিসেবে ফিরে পেলেও অতিরিক্ত অংশ পুঁজিপতি শ্রেণি মুনাফা হিসেবে গ্রহণ করে। এই অতিরিক্ত মূল্যই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য এবং মার্কসের মতে এটিই পুঁজিবাদী শোষণের প্রধান ভিত্তি।
উপসংহার: কার্ল মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। এই তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি শ্রম, মজুরি ও পুঁজির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শ্রেণিসংগ্রাম বোঝার ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব আজও সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।