- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিক সিমোন দ্য বোভোয়ার বিশ্বজুড়ে নারীমুক্তির চেতনায় এক বৈপ্লবিক দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ নারীবাদের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তিনি সমাজ ও পুরুষের চাপিয়ে দেওয়া শৃঙ্খল ভেঙে নারীর নিজস্ব সত্তা, স্বাধীনতা এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ও আপসহীন রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
১। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি: বোভোয়ার বিশ্বাস করতেন মানুষের অস্তিত্ব তার সত্তার পূর্বে আসে। অর্থাৎ, একজন নারী কোনো নির্দিষ্ট নিয়তি নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে না। সমাজ তাকে অবদমিত রাখতে কৃত্তিম নিয়ম ও সংস্কার তৈরি করে দেয়। নারী নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মের মাধ্যমে নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করার অধিকার রাখে।
২। অন্য সত্তা: পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে সবসময় পুরুষের সাপেক্ষে পরিমাপ করা হয়ে থাকে। এখানে পুরুষ হলো প্রধান বা প্রথম পক্ষ এবং নারী হলো কেবলই তার একটি পরিপূরক বা ‘অন্য’ পক্ষ। নারী কোনো স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা নয়, বরং পুরুষের অধীনস্ত এক অবমাননাকর উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
৩। সামাজিক গঠন: নারী জৈবিক কারণে নারী হিসেবে জন্ম নিলেও সমাজ তাকে অবলা ও পরনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে তোলে। শৈশব থেকেই মেয়েদের শেখানো হয় কীভাবে তারা পুরুষদের খুশি করবে এবং নিজেদের ইচ্ছা বিসর্জন দেবে। এই কৃত্রিম সামাজিকীকরণ নারীর স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং নিজস্ব ব্যক্তিত্বের বিকাশকে সম্পূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত করে।
৪। জৈবিক সীমাবদ্ধতা: বোভোয়ার মনে করতেন নারীর সন্তান ধারণের ক্ষমতা বা শারীরিক গঠন কখনোই তার দুর্বলতার কারণ হতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই প্রাকৃতিক বিষয়টিকে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরাধীনতার মূল অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। প্রকৃতি কাউকে দাস বানায় না, বরং সমাজই নারীকে পুরুষের চিরস্থায়ী দাসীতে পরিণত করে।
৫। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা: নারীমুক্তির আন্দোলনের অন্যতম প্রধান এবং প্রথম শর্ত হলো নারীর সম্পূর্ণ আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করা। পুরুষ যদি অর্থনৈতিকভাবে নারীর একমাত্র অভিভাবক হয়, তবে নারী কখনোই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। নিজের উপার্জনের মাধ্যমেই নারী সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং আত্মমর্যাদা লাভ করতে পারে।
৬। মনস্তাত্ত্বিক মুক্তি: সমাজ নারীর মনে এক ধরনের হীনম্মন্যতা এবং পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা স্থায়ীভাবে তৈরি করে দেয়। এর ফলে অনেক নারী নিজেই নিজের বন্দিত্বকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। এই মানসিক দাসত্ব থেকে বেরিয়ে এসে নারীকে সবার আগে নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করতে হবে।
৭। বিবাহের সমালোচনা: প্রচলিত বিবাহ ব্যবস্থাকে বোভোয়ার নারীর স্বাধীনতা হরণের একটি বৈধ সামাজিক ফাঁদ হিসেবে দেখিয়েছেন। এই ব্যবস্থায় নারী তার নিজস্ব নাম, পরিচয় ও স্বাধীনতা হারিয়ে পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। বিবাহ অনেক সময়ই নারীর সৃজনশীল প্রতিভা ও ক্যারিয়ার ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৮। মাতৃত্বের চাপ: মাতৃত্বকে সমাজের পক্ষ থেকে নারীর একমাত্র পরম গৌরব এবং বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে নারী ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়ে এবং বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মাতৃত্ব যেন নারীর প্রগতির পথে অন্তরায় না হয়, সেই বিষয়ে বোভোয়ার বিশেষ জোর দিয়েছেন।
৯। যৌন স্বাধিকার: নারীর নিজের শরীরের ওপর তার সম্পূর্ণ এবং একচ্ছত্র অধিকার থাকা অত্যন্ত জরুরি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সবসময় নারীর যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে এসেছে। নারী যখন তার নিজের শরীরের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে, তখনই প্রকৃত নারীমুক্তি সম্ভব হবে।
১০। যৌনতার রাজনীতি: সমাজ সতীত্ব এবং মাতৃত্বের মতো বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে নারীর যৌনতাকে সর্বদা শৃঙ্খলিত করে রাখে। পুরুষ নিজের ক্ষেত্রে স্বাধীন হলেও নারীর জন্য তৈরি করে কঠোর নৈতিকতার দ্বিচারী নিয়ম। এই বৈষম্যমূলক সামাজিক রাজনীতিকে ভেঙে ফেলাই ছিল বোভোয়ারের দর্শন ও লড়াইয়ের অন্যতম লক্ষ্য।
১১। ঐতিহাসিক অবদমন: মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই নারীর অবদানকে সবসময় অস্বীকার বা খাটো করে দেখা হয়েছে। যুদ্ধের ইতিহাস বা সভ্যতার অগ্রগতিতে কেবল পুরুষের বীরত্বকেই বড় করে প্রচার করা হয়েছে। নারীরা সভ্যতার সমান অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসে তারা সবসময় উপেক্ষিত এবং প্রান্তিক চরিত্র হিসেবে রয়ে গেছে।
১২। শিক্ষার গুরুত্ব: উপযুক্ত এবং আধুনিক শিক্ষা ছাড়া নারীর চেতনার মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। শিক্ষা নারীকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে। শিক্ষিত নারীই কেবল সমাজের বৈষম্যমূলক আচরণকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে পারে।
১৩। শ্রমের মূল্যায়ন: গৃহস্থালির কঠিন কাজগুলোকে সমাজ অনুৎপাদনশীল বা মূল্যহীন মনে করে নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়। এই অদৃশ্য শ্রমের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দেওয়া হয় না। নারীর এই পারিবারিক শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত আবশ্যক।
১৪। যৌথ লড়াই: নারীমুক্তি কেবল কোনো একক নারীর একার সংগ্রাম বা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নয়। এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যৌথ আন্দোলনের নাম। সমাজের সকল স্তরের শোষিত নারীদের এক হয়ে এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
১৫। পুরুষের ভূমিকা: বোভোয়ার মনে করতেন নারীমুক্তি ঘটলে তা পরোক্ষভাবে পুরুষকেও এক ধরনের মানসিক মুক্তি দেবে। কারণ পুরুষকে তখন একচ্ছত্র শাসক বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীর কৃত্রিম চাপ বহন করতে হবে না। একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠন হলে নারী ও পুরুষ উভয়ই পারস্পরিক সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।
১৬। আইনি অধিকার: কেবল মৌখিক আশ্বাস বা সামাজিক সচেতনতা নয়, বরং আইনের পরিমণ্ডলে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সম্পত্তি, উত্তরাধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে সমান অধিকারের আইনি নিশ্চয়তা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আইনগত সুরক্ষা না থাকলে নারী সমাজ কখনোই তাদের ওপর হওয়া নির্যাতন রুখতে পারবে না।
১৭। মানবিক মর্যাদা: নারী কোনো ভোগ্যপণ্য বা সেবাদাসী নয়, সে সর্বাগ্রে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। একজন পুরুষের ঠিক যতটা মানবিক অধিকার ও সম্মান পাওয়ার কথা, নারীরও ততটাই প্রাপ্য। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার মাধ্যমেই নারীমুক্তির মূল লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে।
উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, সিমোন দ্য বোভোয়ারের নারীমুক্তির দর্শন কেবল সমঅধিকারের দাবি নয়, বরং নারীর পূর্ণাঙ্গ মানবিক স্বীকৃতির লড়াই। তিনি নারীদের নিজেদের ভাগ্য বিধাতা হওয়ার এবং ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক চিন্তাধারা সমকালীন বিশ্বে আজও নারী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।