- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা যা কিছু করি, তার অনেক কিছুর সঙ্গেই অর্থনীতির সম্পর্ক আছে। এটি শুধুমাত্র টাকা-পয়সার বিষয় নয়, বরং এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে সমাজ তার সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে মানুষের অসীম চাহিদা পূরণ করে।
শাব্দিক অর্থ: অর্থনীতি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Oikonomia’ থেকে। ‘Oikos’ শব্দের অর্থ হলো ‘গৃহ’ এবং ‘Nomos’ শব্দের অর্থ হলো ‘ব্যবস্থাপনা’। তাই, আক্ষরিক অর্থে এর মানে হলো ‘গৃহের ব্যবস্থাপনা’। এর দ্বারা একটি পরিবার বা সমাজের সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করা হয়, তা বোঝানো হয়।
অর্থনীতি হলো এমন একটি সামাজিক বিজ্ঞান যা সম্পদ উৎপাদন, বণ্টন, এবং ভোগের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করে। এটি মানব আচরণ এবং সম্পদের সীমিততার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করে। অর্থনীতি আমাদের শেখায় কীভাবে আমাদের মতো সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সমাজের চাহিদা পূরণ করা যায়। এটি সমাজের সকল স্তরে সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়, তা বিশ্লেষণ করে।
অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষক ও পণ্ডিত নানা ধরনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো:
১। অ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith): অ্যাডাম স্মিথকে আধুনিক অর্থনীতির জনক বলা হয়। তিনি অর্থনীতিকে “সম্পদের বিজ্ঞান” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতিগুলোর সম্পদের প্রকৃতি এবং কারণ নিয়ে গবেষণা করে। (An inquiry into the nature and causes of the wealth of nations.)
২। অ্যালফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall): তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Principles of Economics’-এ বলেছেন, অর্থনীতি হলো মানুষের সাধারণ জীবনের কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা। এটি ব্যক্তিগত এবং সামাজিক কার্যাবলির সেই অংশ নিয়ে গবেষণা করে যা সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত। (Economics is a study of mankind in the ordinary business of life.)
৩। লায়োনেল রবিন্স (Lionel Robbins): রবিন্স অর্থনীতিকে “দুর্লভতার বিজ্ঞান” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা মানব আচরণকে লক্ষ্য এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য দুর্লভ উপায়ের মধ্যেকার সম্পর্ক হিসাবে অধ্যয়ন করে। (Economics is the science which studies human behavior as a relationship between ends and scarce means which have alternative uses.)
৪। পল স্যামুয়েলসন (Paul Samuelson): স্যামুয়েলসন বলেন, অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান যা সীমিত ও উৎপাদনশীল সম্পদকে কীভাবে সমাজ ব্যবহার করবে, তার ওপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে আলোচনা করে, যাতে তা বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে এবং সময়ের সাথে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বণ্টন করা যায়। (Economics is the study of how societies use scarce productive resources to produce commodities and distribute them among different people.)
৫। জন মেনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes): কেইনসের মতে, অর্থনীতি হলো সেই বিজ্ঞান যা সমাজে কর্মসংস্থান, উৎপাদন, আয় এবং মুদ্রাস্ফীতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করে। (The study of how a society organizes its economic activities, particularly in terms of production, consumption, and distribution.)
৬। কার্ল মার্কস (Karl Marx): মার্কস অর্থনীতিকে উৎপাদন সম্পর্ক এবং সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতি হলো কীভাবে সমাজ উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ করে, তা নিয়ে আলোচনা। (The analysis of the social relations of production and the class structure.)
৭। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte): অগাস্ট কোঁৎ সরাসরি অর্থনীতির কোনো সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি সমাজবিজ্ঞানের একটি অংশ হিসাবে একে দেখেছেন, যেখানে সমাজের সকল দিকের সম্পর্ক আলোচনা করা হয়।
৮। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber): ম্যাক্স ওয়েবারও অর্থনীতির নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেননি, তবে তিনি বলেছেন যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হলো এমন একটি সামাজিক কর্ম, যেখানে লোকেরা তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে।
৯। অ্যারিস্টটল (Aristotle): অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে ‘Oikonomia’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন গৃহস্থালী পরিচালনার ক্ষেত্রে। তিনি এটিকে সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার একটি শিল্প হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
১০। সম্পদের দৃষ্টিকোণ থেকে:- ধ্রুপদী অর্থনীতিবিদদের মতে, “অর্থনীতি একটি সম্পদের বিজ্ঞান। সম্পদের বিজ্ঞান হিসেবে সম্পদ অর্জন, উৎপাদন কাজে এ সম্পদ ব্যবহার এবং এর মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত দ্রব্য ও সেবার ভোগ নিয়ে যে বিজ্ঞানে আলোচিত হয় তাকে অর্থনীতি বলা হয়।”
১১। জে. এস. মিল: তার মতে, “সম্পদের উৎপাদন ও তা বন্টনের ব্যবহারিক বিজ্ঞাি-ই হল অর্থনীতি।”
১২। অধ্যাপক মার্শাল: তিনি বলেছেন, “অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্য সম্পদ নিয়ে আলোচনা নয়, বরং মানবকল্যাণ নিয়ে আলোচনাই মুখ্য।”
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, অর্থনীতি হলো সেই সামাজিক বিজ্ঞান যা সীমিত সম্পদকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে মানুষের অসীম চাহিদা পূরণের উপায় নিয়ে অধ্যয়ন করে। এটি উৎপাদন, বণ্টন, বিনিময় এবং ভোগ—এই চারটি মৌলিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। অর্থনীতি একদিকে যেমন সম্পদের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করে, তেমনি অন্যদিকে এটি সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টনের বিষয়টিও বিবেচনা করে।
উপসংহার: অর্থনীতি হল সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা যা সীমিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং মানুষের অসীম চাহিদা পূরণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এটি উৎপাদন, বন্টন, বিনিময় ও ভোগ সম্পর্কিত মানুষের কার্যাবলি বিশ্লেষণ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং সমাজের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বোঝার জন্য এই বিষয়ের জ্ঞান অপরিহার্য।

