- readaim.com
- 0
উত্তর।।সূচনা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের দর্শন মানব সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি, নৈতিকতা – সব কিছু নিয়েই তিনি তাঁর কালজয়ী চিন্তা প্রকাশ করেছেন। তাঁর এই গভীর চিন্তাভাবনার মধ্যে দাসপ্রথা সম্পর্কিত ধারণাও এক উল্লেখযোগ্য বিষয়, যা তৎকালীন সমাজব্যবস্থাকে বুঝতে এবং তার নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সাহায্য করে। অ্যারিস্টটলের এই দাসপ্রথা সম্পর্কিত ধারণা আজও বিতর্কিত এবং সমালোচিত, তবে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
অ্যারিস্টটল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’-এ দাসপ্রথাকে একটি প্রাকৃতিক এবং প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃতি কিছু মানুষকে শাসক হিসেবে এবং কিছু মানুষকে দাস হিসেবে সৃষ্টি করেছে। তিনি দাসপ্রথাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছেন:
- প্রাকৃতিক দাস (Natural Slaves): অ্যারিস্টটলের মতে, কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই শারীরিক শ্রমে পারদর্শী কিন্তু বুদ্ধিগতভাবে দুর্বল। তারা নিজেরা নিজেদের জীবন পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখে না। এদেরকে তিনি ‘প্রাকৃতিক দাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, এই ধরনের মানুষরা মালিকের অধীনে থেকে কাজ করলে তাদের এবং সমাজের উভয়েরই উপকার হয়। মালিকের বুদ্ধি ও দাসদের শারীরিক শ্রম একত্রিত হয়ে একটি কার্যকর গৃহস্থালি বা রাষ্ট্র গড়ে তোলে।
- যুদ্ধবন্দী দাস (War Slaves): অ্যারিস্টটল এই ধরনের দাসপ্রথাকে শর্তসাপেক্ষে সমর্থন করতেন। তিনি মনে করতেন যে, যদি কোনো জাতি অন্য একটি জাতিকে ন্যায্য যুদ্ধে পরাজিত করে, তবে পরাজিতরা দাসত্ব বরণ করতে বাধ্য। তবে তিনি এর একটি শর্তও আরোপ করেছেন—পরাজিত জাতির মধ্যে যদি বুদ্ধিমান ও যোগ্য ব্যক্তি থাকে, তবে তাদেরকে দাস বানানো উচিত নয়। কারণ, প্রকৃতি তাদের দাস হিসেবে সৃষ্টি করেনি।
অ্যারিস্টটলের মতে, দাসত্ব হলো একটি প্রাকৃতিক সম্পর্ক, যা গৃহস্থালির বা রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খল পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। তিনি দাসদেরকে ‘জীবন্ত সম্পত্তি’ (Living Property) হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁর মতে, একজন মানুষের যেমন দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, তেমনি পরিবারেরও দাসেরা অঙ্গবিশেষ। তিনি আরও বলেছেন যে, দাসদের সাথে মালিকের সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত যেন তারা তাদের মালিকের প্রতি অনুগত থাকে এবং মালিকও তাদের প্রতি সদয় হন। তবে এর মানে এই নয় যে, দাসদের কোনো মানবিক অধিকার আছে। এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি ছিল যে, কিছু মানুষ স্বভাবতই অন্যের অধীনতার জন্য জন্ম নেয়।
উপসংহার: অ্যারিস্টটলের দাসপ্রথা সম্পর্কিত ধারণাটি ছিল মূলত তৎকালীন গ্রিক সমাজের প্রতিচ্ছবি। এটি ছিল এমন একটি তত্ত্ব যা দাসপ্রথাকে নৈতিক এবং দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছিল।
অ্যারিস্টটলের দাসতত্ত্বের মূল কথা হলো – কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই বুদ্ধিমান ও শাসক হওয়ার যোগ্য, আর কিছু মানুষ জন্মগতভাবে শারীরিক শ্রমের জন্য উপযুক্ত এবং তাদের দাস হওয়াটা প্রাকৃতিক।
প্রাচীন গ্রিক সমাজে দাসপ্রথা একটি স্বাভাবিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এথেন্সের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল দাস। স্পার্টাতে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের দিকে মেসেনিয়ানদের পরাজিত করে তাদের দাস বানানো হয়েছিল, যারা ‘হিলট’ নামে পরিচিত ছিল। এই দাসপ্রথা খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্যে তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করে, যেখানে কৃষি ও খনি শিল্পে বিপুল সংখ্যক দাস ব্যবহার করা হতো। ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ করে এবং ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাসপ্রথা পুরোপুরি বিলুপ্ত করা হয়, যা একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

