- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, যা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে পণ্যের দাম পরিবর্তন হলে সেই পণ্যের চাহিদা বা সরবরাহের পরিমাণের কেমন পরিবর্তন হয়। এটি এমন একটি মাপকাঠি, যা থেকে বোঝা যায় যে ক্রেতারা দামের পরিবর্তনের প্রতি কতটা সংবেদনশীল। সহজ কথায়, দাম বাড়লে বা কমলে ক্রেতারা কেনা কমিয়ে দেয় নাকি বাড়িয়ে দেয়—এর হিসাবই হলো মূল্য স্থিতিস্থাপকতা।
শাব্দিক অর্থ: স্থিতিস্থাপকতা বলতে কোনো কিছুর প্রসারণ বা সংকোচন বোঝায়। অর্থনীতির ক্ষেত্রে, এটি দামের পরিবর্তন হলে চাহিদা বা সরবরাহের পরিমাণের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
অর্থনীতিতে, মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো এমন একটি পরিমাপক, যা দেখায় কোনো পণ্যের দামের শতকরা পরিবর্তনের ফলে তার চাহিদার পরিমাণের শতকরা কতটুকু পরিবর্তন হয়। যদি দামের সামান্য পরিবর্তনে চাহিদার পরিমাণ অনেক বেশি পরিবর্তিত হয়, তবে সেই পণ্যকে স্থিতিস্থাপক বলা হয়। আর যদি দামের অনেক বেশি পরিবর্তনে চাহিদার পরিমাণ সামান্য পরিবর্তিত হয়, তবে তাকে অস্থিতিস্থাপক বলা হয়।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই মূল্য স্থিতিস্থাপকতার সংজ্ঞা দিয়েছেন। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা দেওয়া হলো:
১. আলফ্রেড মার্শাল (Alfred Marshall): তিনি চাহিদার স্থিতিস্থাপকতাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন যে, এটি কোনো বাজারে চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি বা হ্রাসের মাত্রাকে বোঝায়, যখন নির্দিষ্ট হারে দাম হ্রাস বা বৃদ্ধি পায়। (Marshall defined the elasticity of demand in a market as great or small according to the amount of the demand increases much or little for a given fall in price, and diminishes much or little for a given rise in price.)
২. পি. সি. এল. জনস্টোন (P. C. L. Johnston): তার মতে, স্থিতিস্থাপকতা হলো এমন একটি অনুপাত, যা কোনো পণ্যের চাহিদার পরিমাণের শতাংশ পরিবর্তন এবং তার দামের শতাংশ পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে। (According to P.C.L. Johnston, elasticity is the ratio of the percentage change in quantity demanded to the percentage change in price of the commodity.)
৩. ডমিনিক সালভাতোরে (Dominick Salvatore): তিনি বলেছেন, চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো একটি পণ্যের চাহিদার পরিমাণে শতকরা পরিবর্তনের অনুপাত, যা সেই পণ্যের দামে শতকরা পরিবর্তনের ফলে ঘটে। (The price elasticity of demand is the percentage change in the quantity of a commodity demanded per unit of time resulting from a given percentage change in the price of the commodity.)
৪. আর. জি. লিপসে (R. G. Lipsey): তার মতে, চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো চাহিদার পরিমাণে আনুপাতিক পরিবর্তনের সাথে দামের আনুপাতিক পরিবর্তনের সম্পর্ক। (The price elasticity of demand is a measure of the responsiveness of quantity demanded to a change in price.)
৫. পল এ. স্যামুয়েলসন (Paul A. Samuelson): তিনি স্থিতিস্থাপকতাকে চাহিদার পরিমাণ এবং দামের পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (Elasticity is a relationship between the quantity demanded and the change in price.)
৬. অ্যালান ওবর্ন (Allan Oborne): তার সংজ্ঞায়, মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো একটি পরিমাপক, যা দেখায় কীভাবে ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তিত হয় যখন কোনো পণ্যের দাম পরিবর্তিত হয়। (Price elasticity is a measure of how buyers’ demand changes when the price of a product changes.)
৭. অ্যাডা এ. বিডল (Ada A. Biddle): তিনি বলেছেন, চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো সেই অনুপাত যা একটি পণ্যের দামের পরিবর্তনের ফলে তার চাহিদার পরিমাণে পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। (Price elasticity of demand is the ratio that indicates the change in the quantity demanded of a product as a result of a change in its price.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে, আমরা মূল্য স্থিতিস্থাপকতাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি যে, এটি হলো একটি অর্থনৈতিক পরিমাপক যা কোনো পণ্যের দামের শতকরা পরিবর্তনের ফলে তার চাহিদার পরিমাণে কী পরিমাণ শতকরা পরিবর্তন হয় তা নির্দেশ করে। এটি থেকে বোঝা যায় যে, দামের পরিবর্তনের প্রতি ক্রেতারা কতটা সংবেদনশীল।
উপসংহার: মূল্য স্থিতিস্থাপকতা অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা, যা ব্যবসা ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধারণাটি ব্যবহার করে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারে, যাতে সর্বোচ্চ লাভ অর্জন করা যায়। একইভাবে, সরকারও কর বা ভর্তুকি নীতির মাধ্যমে বাজারে পণ্যের চাহিদা বা সরবরাহে পরিবর্তন আনতে পারে। স্থিতিস্থাপকতার ধারণাটি ভোক্তাদের আচরণ এবং বাজার কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।
মূল্য স্থিতিস্থাপকতা হলো দামের পরিবর্তনের ফলে চাহিদার পরিমাণে সংঘটিত পরিবর্তন পরিমাপের একটি অনুপাত।
১৯২০-এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতিবিদ হেনরি শুইট (Henry Shuey) এবং জন মেনার্ড কেইন্স (John Maynard Keynes) প্রমুখ মূল্য স্থিতিস্থাপকতার ধারণা নিয়ে কাজ করেন। ২০০০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ৮৭% কোম্পানি তাদের পণ্যের দাম নির্ধারণে স্থিতিস্থাপকতার ধারণা ব্যবহার করে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা অস্থিতিস্থাপক থাকলেও বিলাসবহুল পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।

