- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: দারিদ্র্য এমন একটি জটিল সমস্যা যা যুগ যুগ ধরে মানব সমাজকে প্রভাবিত করে আসছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানবিক উন্নয়নের পথে এক বড় অন্তরায়। দারিদ্র্যের এই জটিল প্রকৃতিকে বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদরা একটি বিশেষ ধারণা নিয়ে এসেছেন, যা ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ নামে পরিচিত। এই ধারণাটি ব্যাখ্যা করে কেন দরিদ্র দেশগুলো সহজে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।

চিত্র: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র।

চিত্র: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র।
শাব্দিক অর্থ: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র বলতে এমন একটি চক্রাকার প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে দারিদ্র্য নিজেই দারিদ্র্যের কারণ হয় এবং দারিদ্র্য থেকেই দারিদ্র্যের সৃষ্টি হয়। এটি একটি স্ব-সৃষ্ট এবং স্ব-চালিত চক্র।
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো একটি তত্ত্ব, যা বোঝায় যে একটি দেশের দারিদ্র্য কীভাবে বিভিন্ন কারণে আরও বেশি দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। এই চক্রে, স্বল্প আয় এবং কম সঞ্চয় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। কম আয়ের কারণে মানুষ পর্যাপ্ত সঞ্চয় করতে পারে না, ফলে বিনিয়োগের অভাব দেখা দেয়। বিনিয়োগের অভাব উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দেয়, যা আবার কম আয়ের দিকে পরিচালিত করে। এভাবে একটি দেশ বা ব্যক্তি ক্রমাগত দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকা পড়ে।
১। র্যাগনার নার্কস (Ragnar Nurkse): তিনি এই ধারণার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা। তাঁর মতে, “দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে একটি দেশের নিম্ন মাথাপিছু আয় কম সঞ্চয় ও কম বিনিয়োগের দিকে নিয়ে যায়, যা আবার কম উৎপাদনশীলতা এবং নিম্ন আয়ের কারণ হয়।” (The vicious circle of poverty is a condition where a country’s low per capita income leads to low savings and low investment, which in turn causes low productivity and low income.)
২। মিডলটন ও জুইট (Middleton & Juit): তাঁদের মতে, “দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে অর্থনৈতিক কারণগুলো পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত হয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি কঠিন করে তোলে।” (The vicious circle of poverty is a situation where economic factors are interlinked to form a structure that makes it difficult to escape poverty.)
৩। পল স্যামুয়েলসন (Paul Samuelson): তিনি বলেন, “দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে সমাজের এক অংশ তাদের নিম্ন আয়, পুষ্টিহীনতা, অসুস্থতা এবং অশিক্ষা থেকে জন্ম নেওয়া কম উৎপাদনশীলতার কারণে দারিদ্র্যের শিকার হয়।” (The vicious circle of poverty is a process where a section of society is trapped in poverty due to low productivity stemming from their low income, malnutrition, illness, and lack of education.)
৪। হ্যারল্ড জে. লাস্কি (Harold J. Laski): তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেননি, তবে তাঁর লেখায় রাষ্ট্র ও সমাজের বৈষম্যের ওপর জোর দিয়েছেন, যা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্যের চক্রকে সমর্থন করে।
৫। লুথার গুলিক (Luther Gulick): তিনি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করেননি, তবে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাঁর তত্ত্বগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরোক্ষভাবে অবদান রাখে, যা দারিদ্র্য দূরীকরণে সহায়তা করতে পারে।
৬। কার্ল মার্কস (Karl Marx): তিনি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের সরাসরি সংজ্ঞা দেননি, তবে তাঁর তত্ত্ব অনুসারে, পুঁজিবাদের শোষণমূলক কাঠামো দরিদ্রদের আরও দরিদ্র করে তোলে, যা এক ধরনের চক্র তৈরি করে।
৭। অধ্যাপক ফিফনার ও প্রেসথাস (P. Fiffner and Presthus): তাঁদের মতে, “দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে জীবনযাত্রার নিম্নমান এবং পুষ্টিহীনতার কারণে দুর্বল স্বাস্থ্য তৈরি হয়, যা আবার দুর্বল উৎপাদনশীলতার কারণ হয়, যা নিম্ন আয়ের দিকে পরিচালিত করে।” (The vicious circle of poverty is a condition where a low standard of living and malnutrition lead to poor health, which in turn causes low productivity, leading to low income.)
৮। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে সরাসরি কোনো সংজ্ঞা না থাকলেও, ‘vicious circle’ শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে একটি সমস্যা আরেকটি সমস্যার জন্ম দেয় এবং এই দুটি সমস্যা ক্রমাগত একে অপরের কারণ হয়।
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে আমরা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র হলো এমন একটি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা দেশের কম আয়, কম সঞ্চয়, কম বিনিয়োগ ও কম উৎপাদনশীলতা একে অপরকে প্রভাবিত করে একটি চক্রের সৃষ্টি করে, যা থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন।
উপসংহার: দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র কেবল একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়, বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা। এই চক্র ভাঙতে হলে শুধু অর্থনৈতিক সমাধানই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোতেও সুষম বিনিয়োগ করা জরুরি। দারিদ্র্য দূরীকরণে গৃহীত প্রতিটি পদক্ষেপ এই চক্রের একটি দুর্বল সংযোগকে শক্তিশালী করে এবং মানব সমাজকে একটি উন্নত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭০ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যে বাস করে। এই দারিদ্র্য চক্র ভাঙার জন্য ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) কর্তৃক উন্নয়ন সহায়তার মডেল গৃহীত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙা।

