- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যে পরিবর্তনগুলো ঘটে চলেছে, তার মধ্যে সামাজিক পরিবর্তন এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। এটি সমাজের কাঠামো, রীতিনীতি, বিশ্বাস, এবং মানুষের জীবনযাত্রায় ঘটে যাওয়া বিবর্তনকে বোঝায়। সময়ের সাথে সাথে সভ্যতা কীভাবে এগিয়ে যায়, তার একটি সুস্পষ্ট চিত্র এই ধারণার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই। সামাজিক পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমেই আসে না, বরং নতুন ধারণা, আন্দোলনের প্রসার এবং মানুষের চিন্তাভাবনার রূপান্তরের মধ্য দিয়েও ঘটে।
শাব্দিক অর্থ: সামাজিক পরিবর্তনকে ইংরেজিতে Social Change বলা হয়। এর শাব্দিক অর্থ হল ‘সমাজের পরিবর্তন’। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন উপাদান যেমন – সামাজিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ এবং আচরণে একটি উল্লেখযোগ্য রূপান্তর আসে। এই পরিবর্তন ধীর বা দ্রুত, ইতিবাচক বা নেতিবাচক, এবং পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত হতে পারে।
এখানে উল্লেখ করা গবেষকদের মধ্যে সকলেই সরাসরি সামাজিক পরিবর্তনের সংজ্ঞা দেননি, তবে তাঁদের কাজ থেকে এই ধারণাটি বোঝা যায়। যেসব গবেষক সরাসরি সংজ্ঞা দিয়েছেন, তাঁদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো।
১। অগবার্ন (Ogburn) এবং নিমকফ (Nimkoff) এর মতে, সামাজিক পরিবর্তন হলো সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। যা সংস্কৃতিতে ঘটে থাকে, যার মধ্যে প্রযুক্তির পাশাপাশি শিল্প, বিজ্ঞান, এবং দর্শনের পরিবর্তনও অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মতে, যখন সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়, তখন সামাজিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়।
২। কার্ল মার্কস (Karl Marx) সমাজকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক পরিবর্তন মূলত উৎপাদনের উপায়ের (means of production) পরিবর্তনের কারণে ঘটে থাকে। যখন সমাজে একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা আসে, তখন তা সমাজের শ্রেণি কাঠামো এবং সম্পর্কের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনে।
৩। অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte) সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক গতিশীলতাকে (Social Statics and Social Dynamics) আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, সমাজের গতিশীলতা বা পরিবর্তন একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া যা একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে ঘটে থাকে। সমাজের এই পরিবর্তন বিজ্ঞানের বিবর্তনের মতো।
৪। এমিল ডুর্খেইম (Émile Durkheim) তাঁর সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় সমাজের বিভিন্ন অংশ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং কীভাবে সময়ের সাথে সাথে এই সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় তা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, শ্রম বিভাজনের (Division of Labor) মতো বিষয়গুলো সামাজিক সংহতির (Social Solidarity) ধরন পরিবর্তন করে, যা সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান দিক।
৫। ম্যাক্স ওয়েবার (Max Weber) সমাজের পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং ধর্ম, সংস্কৃতি এবং নৈতিকতার মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন এবং নতুন ধারণার উন্মেষও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য অপরিহার্য।
অনেক প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক সামাজিক পরিবর্তনের সংজ্ঞা দিয়েছেন। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো:
১। অগবার্ন (Ogburn) এবং নিমকফ (Nimkoff) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন হলো সমাজের মধ্যে বা সমাজকাঠামোর মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি পরিবর্তন। ” (Social change is a change in the society or the social structure.)
২। কিংজলে ডেভিস (Kingsley Davis) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন বলতে সামাজিক সংগঠনের কাঠামোর মধ্যে পরিবর্তনকে বোঝায়।” (By social change is meant only such alterations as occur in the social organization.)
৩। জি. ডি. ম্যাকাইভার (G. D. MacIver) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন হলো জীবনযাত্রার রীতিনীতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে ঘটে যাওয়া রূপান্তর।” (Social change is a change in the established modes of life, social customs, and cultural changes.)
৪। স্যামুয়েল কনিগ (Samuel Koenig) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন হলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি রূপান্তর।” (Social change is a transformation in the mutual relationships of human beings.)
৫। এম. ডি. জনসন (M. D. Johnson) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন সমাজের কাঠামোগত এবং কার্যগত দিকের একটি ধারাবাহিক পরিবর্তন।” (Social change is a continuous change in the structural and functional aspects of society.)
৬। জর্জ সোরোকিন (Georges Sorokin) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন হলো সামাজিক জীবন, সম্পর্ক এবং সমাজের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে একটি ধারাবাহিক রূপান্তর।” (Social change is a continuous transformation in the social life, relationships, and various elements of society.)
৭। ড. এম. এস. ধামনকার (Dr. M. S. Dhamankar) এর মতে, “সামাজিক পরিবর্তন হলো মানুষের চিন্তাভাবনা, মনোভাব এবং আচরণের একটি রূপান্তর।” (Social change is a transformation in the thoughts, attitudes, and behaviors of human beings.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি যে, সামাজিক পরিবর্তন হলো একটি চলমান ও বিবর্তনমূলক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সমাজের কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ, এবং মানুষের আচরণে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর ঘটে থাকে। এই পরিবর্তন প্রযুক্তির আবিষ্কার, অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক আদর্শ, এবং সাংস্কৃতিক গতিশীলতার মতো বিভিন্ন কারণের ওপর নির্ভর করে।
উপসংহার: সামাজিক পরিবর্তন হলো সমাজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা সমাজকে স্থিতাবস্থা থেকে নতুন রূপে নিয়ে আসে। এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে যেমন – মানুষের বিশ্বাস, অর্থনৈতিক কাঠামো, এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে। সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনকে সমাজের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন, যা কখনো দ্রুত বিপ্লবের মাধ্যমে আবার কখনো ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
সামাজিক পরিবর্তন একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। বিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, যেমন ১৯৬০-এর দশকে ইন্টারনেট ও কম্পিউটারের উন্মেষ এবং ১৯৯০-এর দশকে মোবাইল ফোনের প্রসার সমাজের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ২০১০ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কর্মজীবনের ধরনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।

