- readaim.com
- 0
উত্তর::উপস্থাপনা:- খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে এক নতুন ধারার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে, যারা সোফিস্ট নামে পরিচিত। ‘সোফিস্ট’ শব্দের অর্থ হলো ‘জ্ঞানী’। তারা ছিলেন মূলত ভ্রাম্যমাণ শিক্ষক এবং তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুবকদের ব্যবহারিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। তারা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে জ্ঞান, যুক্তি, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং রাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে শিক্ষা দিতেন, যা তৎকালীন সমাজে এক বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের সূচনা করেছিল।
১। জ্ঞানের আপেক্ষিকতা: সোফিস্টরা কোনো চিরন্তন বা পরম সত্যে বিশ্বাস করতেন না। তাদের মতে, সত্য হলো আপেক্ষিক এবং ব্যক্তিনির্ভর। প্রোটাগোরাসের বিখ্যাত উক্তি, “মানুষই সকল বস্তুর পরিমাপক” (Man is the measure of all things), এই দর্শনকেই সমর্থন করে। এর অর্থ হলো, যা কোনো ব্যক্তির কাছে সত্য বলে মনে হয়, তাই তার জন্য সত্য। জগৎ বা কোনো বিষয় সম্পর্কে সার্বজনীন বা বস্তুনিষ্ঠ কোনো জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়।
২। সংশয়বাদী মনোভাব: সোফিস্টরা জ্ঞানতত্ত্বের ক্ষেত্রে ছিলেন চরম সংশয়বাদী। তারা মনে করতেন যে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে আমরা জগতের যে জ্ঞান লাভ করি, তা পরিবর্তনশীল ও আপেক্ষিক। জর্জিয়াসের মতো সোফিস্টরা মনে করতেন, কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই; যদি কিছুর অস্তিত্ব থাকতও, তা জানা সম্ভব হতো না; আর যদি তা জানাও যেত, তবে সেই জ্ঞান অন্যের কাছে প্রকাশ করা যেত না। এই চরম সংশয়বাদ তাদের দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
৩। অলঙ্কারশাস্ত্রের প্রয়োগ: সোফিস্টরা বিশ্বাস করতেন যে, সমাজে সাফল্য লাভের জন্য যুক্তিপূর্ণ ও আকর্ষণীয়ভাবে কথা বলার দক্ষতা অপরিহার্য। তাই তারা অলঙ্কারশাস্ত্র বা Rhetoric-এর ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তাদের মতে, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে যেকোনো বিষয়কে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, এমনকি দুর্বল যুক্তিকেও সবল যুক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। এথেন্সের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সাফল্য লাভের জন্য এই দক্ষতা অত্যন্ত মূল্যবান ছিল।
৪। মানবকেন্দ্রিক দর্শন: পূর্ববর্তী দার্শনিকরা যেখানে জগৎ, প্রকৃতি ও ঈশ্বর নিয়ে চিন্তামগ্ন ছিলেন, সেখানে সোফিস্টরাই প্রথম মানুষের সমস্যা ও সম্ভাবনাকে দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। তারা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। মানুষের আচার-আচরণ, প্রজ্ঞা এবং সমাজে তার অবস্থান নিয়েই ছিল তাদের মূল ভাবনা, যা দর্শনকে এক নতুন খাতে প্রবাহিত করেছিল।
৫। পেশাদার শিক্ষক: সোফিস্টরাই ছিলেন গ্রিসের প্রথম পেশাদার শিক্ষক, যারা অর্থের বিনিময়ে জ্ঞানদান করতেন। তারা বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রে ঘুরে ঘুরে ধনী পরিবারের যুবকদের শিক্ষা দিতেন। তাদের পাঠ্যসূচিতে ছিল ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র, অলঙ্কারশাস্ত্র, আইন ও রাষ্ট্রনীতির মতো বাস্তবমুখী বিষয়। তৎকালীন সমাজে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা এবং এ কারণে প্লেটো ও সক্রেটিসের মতো দার্শনিকরা তাদের সমালোচনাও করতেন।
৬। প্রথা ও আইনের উৎস: সোফিস্টরা প্রচলিত প্রথা, আইনকানুন ও নৈতিকতাকে ঐশ্বরিক বলে মনে করতেন না। তাদের মতে, এই নিয়মগুলো কোনো ঈশ্বর তৈরি করেননি, বরং মানুষই নিজেদের সুবিধার জন্য এগুলো তৈরি করেছে। তাই স্থান-কাল-পাত্রভেদে সামাজিক আইন ও নৈতিকতার নিয়ম পরিবর্তন হতে পারে। তাদের এই ধারণা তৎকালীন ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তার পথ খুলে দিয়েছিল।
৭। রাজনৈতিক শিক্ষা: সোফিস্টরা মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদানে আগ্রহী ছিলেন। এথেন্সের গণতান্ত্রিক পরিবেশে কীভাবে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, কীভাবে আইনসভায় মানুষকে প্রভাবিত করতে হয় এবং কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা যায়, তাই ছিল তাদের শিক্ষার মূল বিষয়। তারা নাগরিকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও দক্ষ করে তোলার ওপর জোর দিতেন, যা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য ছিল।
৮। সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি: সোফিস্টরা সমাজের প্রচলিত যেকোনো ধারণা বা বিশ্বাসকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতেন না। তারা প্রতিটি বিষয়কে যুক্তির কষ্টিপাথরে বিচার করার পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের এই সমালোচনামূলক এবং বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করেছিল। যদিও তাদের বিরুদ্ধে অনেক সময় সত্যকে বিকৃত করার অভিযোগ আনা হতো, তবুও তাদের এই যুক্তিবাদী মনোভাব দর্শনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
উপসংহার সোফিস্ট সম্প্রদায় প্রাচীন গ্রিক দর্শনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল। পরম সত্যের ধারণা থেকে সরে এসে তারা জ্ঞানকে আপেক্ষিক ও মানবকেন্দ্রিক বলে প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থের বিনিময়ে শিক্ষাদান, অলঙ্কারশাস্ত্রের ওপর গুরুত্ব এবং প্রচলিত প্রথার যুক্তিনির্ভর সমালোচনার মাধ্যমে তারা একটি নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক যুগের সূচনা করেন। যদিও তাদের দর্শন নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে, তবুও পাশ্চাত্য চিন্তার বিকাশে সোফিস্টদের অবদান অনস্বীকার্য।
➤ জ্ঞানের আপেক্ষিকতা ➤ সংশয়বাদী মনোভাব ➤ অলঙ্কারশাস্ত্রের প্রয়োগ ➤ মানবকেন্দ্রিক দর্শন ➤ পেশাদার শিক্ষক ➤ প্রথা ও আইনের উৎস ➤ রাজনৈতিক শিক্ষা ➤ সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে এথেন্সের গণতান্ত্রিক বিকাশের যুগে সোফিস্টদের প্রভাব চূড়ায় পৌঁছায়। প্রোটাগোরাস (আনু. ৪৯০-৪২০ খ্রিস্টপূর্ব), জর্জিয়াস (আনু. ৪৮৫-৩৮০ খ্রিস্টপূর্ব) এবং থ্র্যাসিমেকাসের মতো প্রভাবশালী সোফিস্টরা তাদের বাগ্মীতা ও যুক্তির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। পেলোপনেসীয় যুদ্ধের (৪৩১-৪০৪ খ্রিস্টপূর্ব) ফলে সৃষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের দর্শনের প্রসারে সহায়তা করেছিল।

